আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও প্রস্তাবিত গণভোটকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে বিশেষ ‘জয়েন্ট অপারেশন’ (Joint Operation)। গত এক মাসে পরিচালিত এই ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, মাদক এবং রাষ্ট্রবিরোধী কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামসহ ৮০ জন চিহ্নিত অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কক্সবাজারের রামু সেনানিবাসে ১০ পদাতিক ডিভিশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।
সাঁড়াশি অভিযানে তছনছ অপরাধীদের আস্তানা
সংবাদ সম্মেলনে ১০ পদাতিক ডিভিশনের লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাইয়াজ মোহাম্মদ আকবর জানান, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় মোট ৬১টি সফল যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত এসব অভিযানে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বিত শক্তি অংশ নেয়।
অভিযানে চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি, দুর্ধর্ষ ডাকাত দল, কিশোর গ্যাং (Juvenile Gang) এবং বিভিন্ন সহিংস মামলার পলাতক আসামিসহ মোট ৮০ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এই ‘ক্র্যাকডাউন’ (Crackdown) অপরাধী চক্রের সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে বলে মনে করছে নিরাপত্তা বাহিনী।
ড্রোন থেকে জাল নোট: উদ্ধার হওয়া সরঞ্জামের তালিকা দীর্ঘ
অভিযানে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও সরঞ্জামের তালিকাটি বেশ উদ্বেগজনক ও তাৎপর্যপূর্ণ। যৌথ বাহিনীর তল্লাশিতে উদ্ধার করা হয়েছে ১৯টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১০০ রাউন্ড তাজা গুলি (Ammunition) এবং ৯৩টি দেশীয় ধারালো অস্ত্র। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির একটি ড্রোন (Drone), একটি ওয়াকিটকি এবং নাশকতা সৃষ্টির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, অভিযানের সময় ১৩ লাখ টাকার ‘কাউন্টারফিট নোট’ (Counterfeit Notes) বা জাল টাকা জব্দ করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি বা অবৈধ লেনদেনে এই জাল নোট ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল অপরাধী চক্রের। একই সঙ্গে ৬ হাজার ২০১ পিস ইয়াবা, ৫৪১ লিটার দেশীয় মদ এবং বিপুল পরিমাণ গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে, যা মাদকবিরোধী যুদ্ধে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনী পরিবেশ রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’
সেনাবাহিনীর এই কর্মকর্তা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার বোধ ফিরিয়ে আনাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, “গুজব ও সহিংসতা প্রতিরোধে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছি। জনগণ যেন নির্ভয়ে এবং নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে অসামরিক প্রশাসনকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে।”
নির্বাচন পূর্ববর্তী এই সময়ে সন্ত্রাসী অপতৎপরতা দমনে নিয়মিত টহল ও আকস্মিক অভিযান (Surprise Raid) আরও জোরদার করা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। সেনাবাহিনীর এই কঠোর অবস্থান স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিজিবির রামু সেক্টরের মেজর নাজমুস সাকিব, র্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক এএসপি মো. ফারুক এবং পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহমেদ পিয়ারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সমন্বিত এই প্রচেষ্টা আগামী সংসদ নির্বাচনকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ মডেলে রূপান্তর করবে বলে আশা ব্যক্ত করা হয়।