ঢাকার ঐতিহাসিক গণভবন, যা একসময় ছিল ক্ষমতার দাপুটে কেন্দ্রবিন্দু, আজ তা ছাত্র-জনতার বিপ্লবের জীবন্ত স্মৃতিস্মারক। জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এই নবনির্মিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ পরিদর্শন করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা।
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও এক মিনিটের নীরবতা সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই পরিদর্শনে কূটনীতিকরা জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘুরে দেখেন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এই সফরের শুরুতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনার শাসনামলে ও জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া প্রায় চার হাজার মানুষের স্মরণে উপস্থিত সবাই এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।
ভবিষ্যতের জন্য এক বৈশ্বিক শিক্ষা পরিদর্শন শেষে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সাংবাদিকদের জানান, এই জাদুঘরটি কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসের দলিল নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের এক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, “জুলাই জাদুঘর বিশ্বের অন্যান্য সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে 'Global Cooperation' বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা গড়ে তুলবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এমন এক পরিবেশ তৈরি করা, যাতে এ ধরনের দুঃশাসনের পুনরাবৃত্তি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের কোথাও না ঘটে।”
৩৬ দিনের বিপ্লব ও দীর্ঘ দুঃশাসনের প্রতিচ্ছবি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন এই সফরের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, এই জাদুঘরটি মূলত শেখ হাসিনার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতিফলন। তাঁর মতে, জাদুঘরটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত ৩৬ দিনের চূড়ান্ত পর্ব বা 'Final Phase' যেমন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তেমনি বিগত দেড় দশকের শাসনতান্ত্রিক বৈষম্য ও শোষণের উপাদানগুলোও শৈল্পিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা হয়েছে। “ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো এর থেকে শিক্ষা নেওয়া, যাতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ভবিষ্যতে না হয়,” যোগ করেন তিনি।
অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন বিশ্ব কূটনীতিকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশে ইইউ প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলার জাদুঘর পরিদর্শন শেষে তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, “জুলাই জাদুঘর পরিদর্শন আমার জন্য একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি এবং সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধির ক্ষেত্রে এটি একটি শক্তিশালী স্মৃতিস্মারক বা 'Powerful Reminder'।”
উপস্থিত ছিলেন বিশ্বশক্তির প্রতিনিধিরা পরিদর্শন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, ভারত ও পাকিস্তানসহ প্রায় ২৪টি দেশের কূটনীতিকরা অংশ নেন। এছাড়া কসোভো, ফিলিস্তিন, তুরস্ক, ডেনমার্ক, ফ্রান্স এবং ইরানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), ইউনেস্কো (UNESCO), ইউএনএইচসিআর (UNHCR), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এবং আইওএম (IOM)-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা এই ঐতিহাসিক পরিদর্শনে যোগ দেন।
প্রস্তুত হচ্ছে জুলাই জাদুঘর জাদুঘরের প্রধান কিউরেটর তানজিম ওয়াহাব কূটনীতিকদের প্রদর্শিত প্রতিটি নিদর্শনের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। ফ্যাসিস্ট শাসনের কেন্দ্রবিন্দু গণভবনকে যেভাবে স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে, তার কারিগরি ও ঐতিহাসিক দিকগুলো তুলে ধরেন তিনি। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এসডিজি বিষয়ক জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোর্শেদ, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব মো. মফিদুর রহমান।
উল্লেখ্য, জুলাই বিপ্লবের রক্তস্মৃতি ও বীরত্বগাথা নিয়ে সাজানো এই জাদুঘরটি আগামী সপ্তাহেই 'Soft Opening' বা সীমিত পরিসরে উদ্বোধনের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।