বাঙালির উৎসব মানেই পাতের এক কোণে বাহারি পদের হালুয়া। বিশেষ করে শবে বরাত কিংবা পারিবারিক আয়োজনে সুজি বা আটার হালুয়া ছাড়া আমাদের রসনাতৃপ্তি যেন অপূর্ণ থেকে যায়। তবে আধুনিক স্বাস্থ্য সচেতনতার যুগে এই সুস্বাদু খাবারটিই অনেকের কাছে ‘ক্যালরি বম্ব’ হিসেবে পরিচিত। ওজন বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই প্রিয় হালুয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। সঠিক উপকরণ আর রন্ধনশৈলীর পরিবর্তন ঘটাতে পারলে এই হালুয়াই হয়ে উঠতে পারে আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার। পুষ্টিবিদদের মতে, সাধারণ হালুয়াকে ‘গিল্ট-ফ্রি সুপারফুড’ (Guilt-free Superfood) হিসেবে ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব।
শর্করা নয়, বেছে নিন সবজির পুষ্টি
প্রথাগতভাবে আমরা সুজি কিংবা ময়দার হালুয়া খেয়ে অভ্যস্ত, যা মূলত উচ্চমাত্রার রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট। এই ধারণা বদলে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সুজির বদলে লাউ, গাজর কিংবা বিটরুটের মতো সবজি দিয়ে হালুয়া তৈরি করলে তা যেমন সুস্বাদু হয়, তেমনি শরীর পায় পর্যাপ্ত ফাইবার (Fiber)। এই ফাইবার হজমপ্রক্রিয়াকে ধীর করে এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার অনুভূতি দেয়, যা অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। চাইলে এতে কলা যোগ করে পটাশিয়াম ও প্রাকৃতিক মিষ্টতা বাড়ানো সম্ভব।
ড্রাই ফ্রুটস: শক্তির পাওয়ার হাউস
হালুয়ায় কাঠবাদাম, আখরোট কিংবা পেস্তা বাদামের সংযোজন কেবল স্বাদই বাড়ায় না, এটি খাবারটিকে করে তোলে পুষ্টিগুণে ভরপুর বা নিউট্রিয়েন্ট-ডেনস (Nutrient-dense)। ড্রাই ফ্রুটসে থাকা প্রোটিন (Protein) এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরের মেটাবলিজম বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এগুলো দীর্ঘক্ষণ শরীরে এনার্জি সরবরাহ করে এবং অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাকিংয়ের অভ্যাস থেকে মুক্তি দেয়।
ঘি নিয়ে কাটুক ভয়: পরিমিতিবোধই মূল
অনেকেই মনে করেন ডায়েট মানেই ঘি বা ফ্যাট সম্পূর্ণ বর্জন। কিন্তু আধুনিক নিউট্রিশন সায়েন্স বলছে, ঘি হলো ‘গুড ফ্যাট’ বা স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস। এতে থাকা বিউটারিক অ্যাসিড (Butyric Acid) অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং হরমোনের ভারসাম্য (Hormonal Balance) বজায় রাখতে সাহায্য করে। হালুয়ায় অল্প পরিমাণে ঘি ব্যবহার করলে তা খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কমিয়ে দেয়, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বেড়ে যায় না। তবে মনে রাখতে হবে, এখানে ‘পরিমিতিবোধ’ বা মডারেশনই আসল চাবিকাঠি।
চিনিকে না, বেছে নিন প্রাকৃতিক বিকল্প
ওজন বৃদ্ধির প্রধান খলনায়ক হিসেবে ধরা হয় রিফাইন্ড সুগার বা চিনিকে। হালুয়াকে স্বাস্থ্যকর করতে চিনির বদলে গুড় কিংবা খেজুরের পেস্ট ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। গুড়ে থাকা আয়রন এবং খনিজ উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অন্যদিকে, খেজুরের প্রাকৃতিক মিষ্টতা এবং ফাইবার রক্তে শর্করার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করেই মিষ্টির চাহিদা পূরণ করে।
পুষ্টিবিদের শেষ কথা
সঠিক উপাদান নির্বাচন এবং রান্নার পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তন আনলে হালুয়া আর ‘ডায়েট ব্রেকার’ (Diet-breaker) থাকবে না। বরং এটি আপনার স্বাস্থ্যকর জীবনধারার একটি অংশ হয়ে উঠতে পারে। পুষ্টিবিদদের মতে, যেকোনো খাবারই যদি সঠিক অনুপাতে এবং সঠিক সময়ে গ্রহণ করা হয়, তবে তা শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হয় না। তাই এবার উৎসবে অপরাধবোধ ছাড়াই উপভোগ করুন আপনার প্রিয় পদের হেলদি হালুয়া।
সূত্র: হেলথ শট