উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে এক অবর্ণনীয় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনলাইন গেমিং (Online Gaming) ও ডিজিটাল আসক্তির চরম মূল্য দিতে হলো এক পরিবারকে। মা-বাবার আপত্তির জেরে গাজিয়াবাদের ভারত সিটি আবাসন এলাকার একটি বহুতলের ৯ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে তিন সহোদরা। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ভোরের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং আধুনিক যুগে কিশোর-কিশোরীদের ক্রমবর্ধমান ‘ডিজিটাল অ্যাডিকশন’ (Digital Addiction) নিয়ে ফের বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সমাজকে।
ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আর্তনাদ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত তিন বোনের নাম পাখি (১২), প্রাচী (১৪) এবং বিশিকা (১৬)। তারা সবসময় একসাথে থাকতেই পছন্দ করত; খাওয়া-দাওয়া, স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে ঘুমানো—সবই ছিল তিনজনের অভিন্ন রুটিন। বুধবার রাত ২টোর দিকে ভারত সিটি আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা বিকট শব্দ শুনতে পান। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, আবাসন চত্বরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে তিন বোন। দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। শালিমার গার্ডেন এলাকার সহকারী পুলিশ কমিশনার (ACP) অতুল কুমার সিং জানান, প্রাথমিক তদন্তে এটি আত্মহত্যা বলেই নিশ্চিত হওয়া গেছে।
কোভিড-পরবর্তী ‘ভার্চুয়াল’ মরণফাঁদ তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। কোভিড-১৯ (COVID-19) মহামারীর সময় যখন স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল, তখন থেকেই এই তিন কিশোরী স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে পড়ে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা মূলত কোরিয়ান ‘টাস্ক-ভিত্তিক’ (Task-based Korean Game) অনলাইন গেম খেলত। এই ধরনের গেমগুলোতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ বা টাস্ক দেওয়া হয়, যা কিশোর মনে তীব্র উত্তেজনা ও নেশার সৃষ্টি করে। এই নেশা এতটাই গভীরে পৌঁছেছিল যে, তারা নিয়মিত স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। এমনকি বড় বোন বিশিকা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ায় পরিবারে নিয়মিত অশান্তি লেগে থাকত।
সুইসাইড নোট ও রহস্যময় ডায়েরি ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে, যা পড়লে পাষাণ হৃদয়ও কেঁপে উঠবে। সেখানে মা-বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে তিন বোন লিখেছে, তারা নিজেদের ইচ্ছায় এই পথ বেছে নিচ্ছে। চিরকুটে লেখা ছিল— ‘ইজ ডায়েরি মে জো কুছ ভি লেখা হ্যায় ও সব পড় লো কিউকি ইয়ে সব সচ হ্যায়’ (এই ডায়েরিতে যা কিছু লেখা আছে সব পড়ো, কারণ সবই সত্যি)। নোটটির শেষে একটি হাতে আঁকা ‘কান্নাকাটি করা ইমোজি’ এবং তার পাশে লেখা ছিল, ‘আই অ্যাম রিয়েলি সরি, সরি পাপা।’ পুলিশ বর্তমানে সেই ডায়েরিটি পরীক্ষা করছে, যেখানে সম্ভবত তাদের মানসিক যন্ত্রণার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় সতর্কতা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহতদের মোবাইল ফোন জব্দ করে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তারা ইন্টারনেটে ঠিক কোন ধরনের গেম বা ‘ব্লু হোয়েল’-এর মতো কোনো মরণফাঁদে পা দিয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন গেমিং সাইকোলজি বা গেমের ভেতরে থাকা ইন-অ্যাপ টাস্ক (In-app task) অনেক সময় কিশোর-কিশোরীদের রিয়েলিটি বা বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
গাজিয়াবাদের এই ঘটনাটি সারা দেশে অভিভাবক মহলে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল লাইফস্টাইলে সন্তানদের স্ক্রিন টাইম (Screen Time) নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের (Mental Health) প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া কতটা জরুরি, এই ট্র্যাজেডি যেন তারই এক চরম সতর্কবার্তা।