আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ ঘিরে ক্রিকেট বিশ্বে নাটকীয়তা চরমে পৌঁছেছে। একদিকে পাকিস্তান সরকার ও পিসিবি (PCB) নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে ভারতের বিপক্ষে না খেলার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, অন্যদিকে ভিন্ন এক চিত্রে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তান নারী ক্রিকেট দলকে। একই দিনে একই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে যাওয়া দুই দলের ক্ষেত্রে পিসিবির এমন ‘দ্বিমুখী’ অবস্থান এখন তীব্র সমালোচনার মুখে। ক্রিকেট বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—পাকিস্তান কি আসলেই বিশ্বকাপের মতো ‘গ্লোবাল ইভেন্ট’ বয়কট করার ক্ষমতা রাখে?
নারী ক্রিকেটে সরব, পুরুষ ক্রিকেটে নীরব? সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি। এই দিনটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান পুরুষ দলের ভারতের মুখোমুখি হওয়ার কথা থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে বয়কটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ একই দিনে থাইল্যান্ডে আয়োজিত ‘নারী এশীয় কাপ রাইজিং স্টার’ টুর্নামেন্টে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে পাকিস্তান নারী ‘এ’ দল।
থাইল্যান্ডের এই টুর্নামেন্টের জন্য ইতিমধ্যে দল ঘোষণা করেছে পিসিবি, যেখানে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে কোনো আপত্তি জানানো হয়নি। একই দিনে এক দেশের সাথে দুটি ভিন্ন টুর্নামেন্টে ভিন্ন অবস্থান পিসিবির প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত বিভ্রান্তিকেই স্পষ্ট করছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
আইসিসির নেপথ্য তৎপরতা ও রাজস্ব সংকট পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো আইসিসিকে (ICC) তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না জানালেও, সংস্থাটি পর্দার আড়ালে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বিপুল পরিমাণ ‘ব্রডকাস্টিং রেভিনিউ’ (Broadcasting Revenue) এবং স্পনসরশিপ মানি। এই একটি ম্যাচ বাতিল হওয়া মানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের পকেটে বিশাল অঙ্কের লোকসান। আইসিসির সব স্টেকহোল্ডার (Stakeholders) এবং সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলো চায় যেকোনো মূল্যে এই ম্যাচটি মাঠে গড়াক।
বয়কটের পরিণাম: আইসিসির নিয়ম কী বলছে? যদি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান কোনো একটি নির্দিষ্ট ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে আইসিসির সংবিধানে তার সুনির্দিষ্ট কিছু ধারা রয়েছে:
১. ওয়াকওভার (Walkover): আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল নির্দিষ্ট ম্যাচে মাঠে না নামলে প্রতিপক্ষ দলকে জয়ী ঘোষণা করা হয়। এক্ষেত্রে কোনো খেলা ছাড়াই ভারত পূর্ণ ২ পয়েন্ট পেয়ে যাবে। ২. পয়েন্ট টেবিলে প্রভাব: একটি ম্যাচ না খেললে পুরো টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কারের সরাসরি কোনো নিয়ম নেই। তবে পয়েন্ট হারানোর ফলে সেমিফাইনাল বা নক-আউট পর্বে পৌঁছানোর সমীকরণ পাকিস্তানের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। ৩. আর্থিক জরিমানা ও নিষেধাজ্ঞা: নির্দিষ্ট ম্যাচ বয়কটের কারণে আইসিসি পিসিবি-কে বড় অঙ্কের জরিমানা করতে পারে। এছাড়া, সরকারি হস্তক্ষেপের (Government Interference) কারণে কোনো বোর্ড যদি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তবে সেই বোর্ডের সদস্যপদ স্থগিত (Suspension) করার নজির আইসিসির ইতিহাসে রয়েছে।
ক্রিকেট বিশ্বের উদ্বেগ ক্রিকেট মহলের মতে, পাকিস্তান যদি বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করে, তবে তা কেবল একটি খেলার হার-জিত নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি বড় ধরনের সংকটে ফেলবে। অন্যদিকে, নারী দলের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, সংকটটি যতটা না নিরাপত্তার, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক দরকষাকষির।
এখন দেখার বিষয়, আইসিসির প্রবল চাপ আর অর্থনৈতিক সমীকরণের মুখে পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত তাদের জেদ বজায় রাখে নাকি ‘ওয়াকওভার’ দিয়ে ভারতকে পয়েন্ট উপহার দেয়।