কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে গোয়েন্দা নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযানের মুখে ধরা পড়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসা (ARSA)-র অন্যতম শীর্ষ কমান্ডার জাহিদ হোসেন লালু (৪০)। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ভোরে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে পরিচালিত এক রুদ্ধশ্বাস অভিযানে তাকে গ্রেফতার করে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ আভিযানিক দল। লালু কেবল একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীই নয়, তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনপন্থী নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহ এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর (DGFI) কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার রেজওয়ানুল হক হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি।
কুতুপালং ক্যাম্পে রুদ্ধশ্বাস অভিযান
বুধবার দুপুরে উখিয়া ডিগ্রি কলেজ সংলগ্ন সেনা ক্যাম্পে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন ক্যাম্প অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সায়মন সিকদার। তিনি জানান, বিশ্বস্ত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেনাবাহিনী জানতে পারে, কুতুপালং ১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি বাড়িতে আরসার শীর্ষ স্তরের এক নেতা অবস্থান করছে। ভোর ৭টার দিকে যৌথ বাহিনী ওই এলাকাটি কর্ডন (Cordon) করে তল্লাশি শুরু করে। বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে লালু কৌশলে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ধাওয়া দিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
কে এই জাহিদ হোসেন লালু?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার জাহিদ হোসেন লালু রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসা-র প্রধান হাফেজ আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী (Bodyguard) হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় আরসার হয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করে আসছিলেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মাদক ব্যবসা (Drug Trafficking), অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যেসব চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে জড়িত লালু
লেফটেন্যান্ট কর্নেল সায়মন সিকদার জানান, লালুর বিরুদ্ধে একাধিক হাই-প্রোফাইল (High-profile) হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. মাস্টার মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড: ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী ও প্রত্যাবাসনপন্থী নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহকে হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন লালু। ২. স্কোয়াড্রন লিডার রেজওয়ান হত্যা: সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালীন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার রেজওয়ানুল হক হত্যাকাণ্ডের অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। ৩. মাদ্রাসা গণহত্যা: ২০২১ সালে ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসায় হামলা চালিয়ে ৬ জন ছাত্র ও শিক্ষককে নৃসংশভাবে হত্যার ঘটনায় লালুর নেতৃত্বাধীন বাহিনী অংশ নিয়েছিল।
যৌথ বাহিনীর শক্ত অবস্থান
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং অপরাধীদের নির্মূলে এই গ্রেফতারকে একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট (Turning Point) হিসেবে দেখা হচ্ছে। আরসার চেইন অফ কমান্ড (Chain of Command) ভেঙে দিতে লালুর গ্রেফতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গ্রেফতারকৃত সন্ত্রাসীকে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।