আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে লক্ষ্মীপুরে ব্যালট পেপারে ব্যবহারের জন্য জাল সিল তৈরির এক চাঞ্চল্যকর ছক ফাঁস হয়েছে। এই জালিয়াতির ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে নাম আসা স্থানীয় জামায়াত নেতা সৌরভ হোসেন শরীফ (৩৪) বর্তমানে ‘লাপাত্তা’ রয়েছেন। ১৬ ঘর বিশিষ্ট ছয়টি জাল সিলসহ গ্রেফতারকৃত মুদ্রণ ব্যবসায়ী সোহেল রানা আদালতে অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় (Section 164) জবানবন্দি দেওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত এই নেতা অজ্ঞাতবাসে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
আদালতে স্বীকারোক্তি ও জালিয়াতির চিত্র
লক্ষ্মীপুর জজ আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল আহাদ শাকিল নিশ্চিত করেছেন যে, বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রেজাউল হকের আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন ব্যবসায়ী সোহেল রানা। সেখানে তিনি স্পষ্ট জানান, জামায়াত নেতা শরীফ হোসেন সৌরভের নির্দেশেই তিনি এই বিশেষ সিলগুলো তৈরি করেছিলেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার ও আত্মগোপন
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি সৌরভ হোসেন শরীফ গত ৩০ জানুয়ারি ব্যবসায়ী সোহেলের হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp) নম্বরে এই সিলগুলো তৈরির অর্ডার দেন। জালিয়াতি ধরা পড়ার ভয়ে এবং পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের মুখে অভিযুক্ত এই নেতা বর্তমানে পলাতক। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জবানবন্দির খবর জানাজানি হওয়ার পর থেকেই তিনি এলাকায় নেই এবং তার মুঠোফোনটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
পুলিশি অভিযান ও মামলার আপডেট
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লক্ষ্মীপুর শহরের পুরাতন আদালত সড়কের ‘মারইয়াম প্রিন্টার্স’ (Mariyam Printers) নামক একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ী সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ১৬টি ঘর বিশিষ্ট ছয়টি বিশেষ রাবার স্ট্যাম্প বা সিল জব্দ করা হয়।
এই ঘটনায় সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (SI) হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে সৌরভ ও সোহেলকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ কর্মকর্তা রায়হান কাজেমী বলেন, “গ্রেফতারকৃত সোহেল জবানবন্দিতে শরীফের নাম প্রকাশ করেছেন। আমরা এখন প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছি।”
সংগঠনের অবস্থান ও তদন্ত কমিটি
এদিকে, অভিযুক্ত সৌরভ হোসেন শরীফের কর্মকাণ্ডে বিব্রত অবস্থায় পড়েছে জেলা জামায়াত। লক্ষ্মীপুর পৌর জামায়াতের আমির আবুল ফারাহ নিশান জানিয়েছেন, অভিযুক্ত শরীফকে ইতিমধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং পুরো বিষয়টি তদন্ত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা জামায়াতের আমির মাস্টার রুহুল আমীন জানিয়েছেন, জালিয়াতির মতো গুরুতর অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচনী ডামাডোলের মাঝে জাল সিল তৈরির এই ঘটনা স্থানীয় রাজনীতি ও ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এমন জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।