দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার ও অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দর এখন কার্যত অচল। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি সংস্থা ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’কে দেওয়ার প্রতিবাদে এবং ওই চুক্তি বাতিলের দাবিতে শ্রমিকদের লাগাতার কর্মবিরতিতে থমকে গেছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। এই চরম অচলাবস্থা নিরসনে অবশেষে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছেন নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।
১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে আন্দোলনকারীরা এই রুদ্ধদ্বার আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। এর আগে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের অনড় অবস্থানের কারণে বৈঠকের স্থান ও সময় নিয়ে কয়েক দফা নাটকীয়তা তৈরি হয়।
অবরুদ্ধ উপদেষ্টা ও উত্তাল বন্দর এলাকা
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। নৌ-পরিবহন উপদেষ্টার আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত শ্রমিক ৪ নম্বর জেটি গেট থেকে কাস্টমস মোড় পর্যন্ত অবস্থান নেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। উপদেষ্টা বন্দর ভবনে প্রবেশের সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিক-কর্মচারীদের বাধার মুখে পড়েন। আন্দোলনকারীরা তাঁর গাড়িবহর আটকে দিয়ে ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘গো ব্যাক অ্যাডভাইজার’ এবং ‘মা-মাটি-মোহনা বিদেশিদের দেব না’—এরকম বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। প্রায় ১৫ মিনিট অবরুদ্ধ থাকার পর পুলিশি পাহারায় তিনি ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। এ সময় এক দল শ্রমিক স্লোগান দিতে দিতে ভবনের ভেতরেও ঢুকে পড়েন।
বোট ক্লাব নয়, আলোচনা বন্দর ভবনেই
সংকট নিরসনে শুরুতে পতেঙ্গার বোট ক্লাবে শ্রমিকদের সাথে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন উপদেষ্টা। তবে শ্রমিক নেতারা সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির সংবাদমাধ্যমকে জানান, বন্দর-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত এবং আলোচনা বন্দর ভবনেই হতে হবে। শ্রমিকদের এই অনড় অবস্থানের মুখে শেষ পর্যন্ত বিকেল ৩টায় বন্দর ভবনেই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
শ্রমিকদের দাবি ও লিজ বিতর্ক
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি হলো—এনসিটি (NCT) পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে করা চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। শ্রমিক নেতাদের দাবি, এটি একটি ‘দেশবিরোধী চুক্তি’ এবং এর ফলে বন্দরের স্বনির্ভরতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে। হুমায়ুন কবির বলেন, “উপদেষ্টা মহোদয় হয়তো এই চুক্তির অর্থনৈতিক নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। আমরা তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তাঁকে বোঝাব যে কেন এই চুক্তি বন্দরের স্বার্থ পরিপন্থী।”
অর্থনৈতিক প্রভাব ও লজিস্টিকস সংকট
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের ফলে বন্দরের অপারেশনাল (Operational) কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেওয়ায় জেটি ও ইয়ার্ডে কনটেইনার জট তীব্র আকার ধারণ করছে। বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী জানান, বন্দরের স্বাভাবিক লজিস্টিকস (Logistics) সাপ্লাই চেইন বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হলেও শ্রমিকরা কাজে না ফিরলে কার্যক্রম স্বাভাবিক করা অসম্ভব।
বাণিজ্যিক মহলের উদ্বেগ
বন্দরের এই অচলাবস্থায় চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আমদানি-রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাপ্লাই চেইন (Supply Chain) ব্যাহত হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ারও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এখন সবার নজর বন্দর ভবনের ভেতরের দিকে। উপদেষ্টার সাথে শ্রমিকদের এই আলোচনা থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান আসে কি না, নাকি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ ইস্যু নিয়ে বন্দরের এই অচল দশা দীর্ঘায়িত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।