সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ‘দেশের একমাত্র সমাজভিত্তিক মৎস্যচাষ প্রকল্প’ ঘিরে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের আওতায় সুফলভোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত উন্নত জাতের মাছের পোনা ও আনুষঙ্গিক উপকরণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় মৎস্যচাষিরা। অভিযোগ উঠেছে, রুই-কাতলার মতো দামী মাছের বদলে সস্তা সিলভার কার্প দিয়ে বরাদ্দ সমন্বয় করা হচ্ছে এবং উপকরণ না দিয়েই মাস্টার রোলে (Master Roll) জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে।
নিমগাছিতে উত্তেজনা: বিক্ষোভের মুখে কর্মকর্তারা
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তাড়াশের নিমগাছি এলাকায় ‘সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ (Community Based Fisheries Management) কার্যালয় চত্বরে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। প্রকল্পের সুফলভোগী সদস্যরা অভিযোগ করেন, তাদের জন্য নির্ধারিত সরকারি সহায়তা তছরুপ করে পকেটস্থ করছেন সংশ্লিষ্ট এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী ও কর্মকর্তারা। বিক্ষোভের সময় কার্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং সাধারণ চাষিরা তাদের পাওনা আদায়ের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।
বরাদ্দে অনিয়ম ও ‘সিলভার কার্প’ সিন্ডিকেট
প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে (Financial Year) তাড়াশ উপজেলার ১১৫টি পুকুরকে এই সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি পুকুরের জন্য ৯২ কেজি কার্প জাতীয় মাছের মিশ্র পোনা, ২৪ বস্তা বিশেষ ফিশ ফিড (Fish Feed), ৫০ কেজি টিএসপি সার, ৫০ কেজি ইউরিয়া সার ও একটি সাইনবোর্ড বরাদ্দ রয়েছে।
তবে সুফলভোগীদের অভিযোগ, কাগজ-কলমে রুই (৩০%), কাতলা (৩০%) ও মৃগেল (২০%) মাছের পোনা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রায় ৭০ শতাংশই দেওয়া হচ্ছে অত্যন্ত কম দামের সিলভার কার্প। আসানবাড়ী গ্রামের পুরান পুকুরের সভাপতি শরিফুল ইসলাম ও বিনসাড়া পাঁচআনা পুকুরের সভাপতি জামাল উদ্দীনসহ একাধিক চাষি জানান, “কাতলার পোনা নেই বললেই চলে। অথচ সস্তা সিলভার কার্প দিয়ে বালতি ভরে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া মাছের সার ও খাদ্য ছাড়াই আমাদের মাস্টার রোলে সই করতে বাধ্য করা হচ্ছে।”
কোটি টাকার লুটপাটের ইতিহাস!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনিয়মের এই জাল কেবল পোনা বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে এই প্রকল্পের আওতায় জলাশয় সংস্কারের জন্য ১ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা, মাছ চাষ প্রদর্শনী বাবদ ১৮ লাখ টাকা এবং মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য স্টেইনলেস স্টিলের (Stainless Steel) বক্স সরবরাহের জন্য ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব বরাদ্দের সিংহভাগই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে অনেক পুকুরে উন্নত মানের কোনো সরঞ্জাম বা সংস্কারের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি।
সরেজমিনে তদন্ত ও দায় এড়ানোর চেষ্টা
সরেজমিনে নিমগাছি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অফিস সহায়ক আবুল কায়েস মামুন চাষিদের মাঝে পোনা বিতরণের চেষ্টা করছেন। তবে পোনায় ভেজাল ধরা পড়লে চাষিরা তা গ্রহণে অস্বীকার করেন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় কোনো সিনিয়র কর্মকর্তা কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না।
যোগাযোগ করা হলে তাড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন জানান, “আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করব। চাষিদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হবে।” তবে প্রকল্পের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. শহীদুল ইসলাম দায়সারাভাবে জানান, “বিতরণের সময় আমি অফিসে ছিলাম না, তবে সুফলভোগীরা সব উপকরণই পাবেন।”
অন্যদিকে, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই বলে জানালেও সংবাদকর্মীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই ‘সমাজভিত্তিক’ প্রকল্পটি মূলত দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে যদি দোষীদের আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে সরকারের এই মহৎ উদ্দেশ্য মুখ থুবড়ে পড়বে এবং প্রকৃত মৎস্যচাষিরা বঞ্চিতই থেকে যাবেন।