রংপুর-৩ আসনের নির্বাচনী সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে নগরীর নুরপুরস্থ নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সিদ্ধান্ত জানান। তবে তার এই সরে দাঁড়ানো কেবল কোনো কৌশলগত পদক্ষেপ নয়, বরং হিজড়াসহ দেশের সব সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় সংসদে ‘সংরক্ষিত আসন’ (Reserved Seats) নিশ্চিত করার এক বড় আন্দোলনের অংশ।
সংরক্ষিত আসনের দাবিতে ঐতিহাসিক প্রতিবাদ সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ারা ইসলাম রানী জানান, পিছিয়ে থাকা বা ‘পিছিয়ে রাখা’ জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হলে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব জরুরি। তিনি বলেন, “আমরা যুগের পর যুগ ধরে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। পৈতৃক সম্পত্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা কর্মসংস্থান—সবক্ষেত্রেই আমরা বৈষম্যের শিকার। এমনকি মৃত্যুর পর দাফন করতেও আমাদের বাধা দেওয়া হয়েছে। এই প্রান্তিকতার অবসান ঘটাতে আমরা সরকারের নিকট এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২৫’-এর রূপরেখা অনুযায়ী অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন (Affirmative Action) প্রয়োগের দাবি জানাচ্ছি।”
নারীদের উদাহরণ ও সমবণ্টনের দাবি রানী তার বক্তব্যে রাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, ১৯৭৩ সালে নারীদের জন্য ১৫টি সংরক্ষিত আসন ছিল, যা আজ ৫০টিতে উন্নীত হয়েছে। এর ফলে নারীরা সমাজ ও রাষ্ট্রে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পেরেছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও হিজড়া, আদিবাসী বা হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য কোনো সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আপনারা যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছেন, সেখানে আমাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি কোথায়? আমাদের বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সম্ভব নয়।”
রবীন্দ্রনাথের দর্শনে অধিকারের লড়াই নিজের বক্তব্যের এক পর্যায়ে রানী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেন, “হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। পশ্চাতে রাখিয়া আসিছ যারে, সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।” তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠী সমাজের বোঝা হতে চায় না, বরং তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালনে নিবেদিত হতে চায়।
হরিণ প্রতীকে ভোট না দেওয়ার অনুরোধ রংপুর-৩ আসন থেকে এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে প্রায় ২৪ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন রানী। এবারও তাকে নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। তবে বৃহত্তর স্বার্থে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে তিনি তার নির্ধারিত ‘হরিণ’ প্রতীকে ভোট না দিতে ভোটারদের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন। একইসঙ্গে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যেন কোনো ধরনের সংঘাত বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে তার কর্মী-সমর্থকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রানীর এই সিদ্ধান্ত রংপুরের নির্বাচনী ময়দানে যেমন নতুন মেরুকরণ তৈরি করবে, তেমনি জাতীয় পর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। তার এই ‘Affirmative Action’-এর দাবি এখন দেশের নীতি-নির্ধারণী মহলে কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই দেখার বিষয়।