প্রশ্ন উঠছে, এসব ইশতেহার থেকে আসলে দেশের মানুষ কী বার্তা পাচ্ছে? কিংবা নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোই বা তাদের ইশতেহারের মাধ্যমে মানুষকে সামনের দিনগুলোর জন্য কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে?
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ ছোট-বড় বিভিন্ন দল ভোটারদের কাছে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরতে ইতিমধ্যেই ইশতেহার বা ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনকে সামনে রেখে মূলত বিএনপি ও তার পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেই বেশি তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইশতেহারগুলোয় কিছু নতুন বক্তব্য দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টার বহিঃপ্রকাশ যেমন ঘটেছে, তেমনি আবার অনেক কিছুই আছে, যা দীর্ঘকাল ধরেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির তালিকায় ছিল, যা দলগুলো ক্ষমতায় থেকেও বাস্তবায়ন করেনি।
তাদের মতে, দলগুলো তাদের অনেক প্রতিশ্রুতিই কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট কর্মপন্থা উল্লেখ করেনি। তবে প্রায় সব দলের ইশতেহারেই দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে সাংবিধানিক সংস্কার গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করেন তারা। এই সাংবিধানিক সংস্কারের কয়েকটি প্রশ্নেই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে সংসদ নির্বাচনের সাথেই। বিএনপির ইশতেহার কী বলছে
এবারই প্রথমবারের মতো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমানের নেতৃত্বেই এবার দলটির নির্বাচনী তৎপরতা চলছে। শুক্রবার ঘোষিত দলটির ইশতেহারে দেশের প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষক কার্ড ও কৃষি বীমা, এক লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা, শিক্ষাক্ষেত্রে ‘মিড ডে মিল’ বা দুপুরের খাবার, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস এবং বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যের কথা জানানো হয়েছে।
মোট ৫১টি বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেছেন, ‘কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা যাবে না, যদি না দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেওয়া যায়।’
এই ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান, জুলাই হত্যার বিচার এবং গণ-অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষাসহ আরো অনেক বিষয়কে স্থান দিয়েছে বিএনপি।
এ ছাড়া আরো যা আছে তার মধ্যে আছে, পাঁচ লাখ সরকারি শূন্য পদে কর্মচারী নিয়োগ, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়ন করা, পেনশন ফান্ড গঠন ও বেকারভাতা চালু, আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
প্রসঙ্গত, বিএনপির ইশতেহারের কিছু বিষয় ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারেও ছিল। অবশ্য বিএনপি নিজেও বলেছে, বিভিন্ন সময়ের পরিকল্পনার ধারাবাহিকতাতেই এবারের ইশতেহার তৈরি করেছে তারা।
আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ‘ইশতেহারের কিছু বিষয়ের মধ্যে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টার প্রতিফলন আছে এবং সেটাই রাজনৈতিক দলের জন্য স্বাভাবিক।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতসহ সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে, রাষ্ট্র সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে।
কিন্তু এগুলো কিভাবে হবে তার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা কিংবা নির্দেশনা নেই। দলগুলোর উচিত, এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করা।’