দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম এখন কার্যত নিথর। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে থমকে গেছে বন্দরের সমস্ত কর্মযজ্ঞ। রোববার (৮ জানুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির ফলে বন্দরের অভ্যন্তরে পণ্য খালাস থেকে শুরু করে বহির্নোঙরে জাহাজের কার্যক্রম—সবই এখন বন্ধ। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতি ও ‘Supply Chain’ বা সরবরাহ চেইন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
স্তব্ধ অপারেশনাল কার্যক্রম: জেটি থেকে বহির্নোঙরে হাহাকার
সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্দরের ভেতরে বিশাল সব ক্রেন ও ‘Cargo Handling’ সরঞ্জামগুলো অলস পড়ে আছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ অন্যান্য জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস (Unloading) পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা। শুধু জেটিই নয়, এবার ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে বহির্নোঙরেও (Outer Anchorage)। শ্রমিকদের ঘোষণা অনুযায়ী, কোনো নতুন জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা হচ্ছে না। যারা পণ্য ডেলিভারি নিতে এসেছিলেন, তারাও ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে। পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিক সাপোর্ট বন্ধ থাকায় বন্দরের ইয়ার্ডগুলোতে কনটেইনার জটের আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।
উপদেষ্টার আশ্বাস বনাম শ্রমিকদের রাজপথ: কেন এই অচলাবস্থা?
এই অস্থিরতার সূত্রপাত মূলত এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। গত বৃহস্পতিবার নৌ-উপদেষ্টার সঙ্গে শ্রমিক নেতাদের এক ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনার প্রেক্ষিতে শুক্রবার ও শনিবার ধর্মঘট স্থগিত রাখা হয়। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, উপদেষ্টার দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনো ‘Visible Progress’ বা দৃশ্যমান অগ্রগতি তারা দেখতে পাননি। ফলে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হওয়ার অভিযোগে তারা আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। শ্রমিক নেতাদের স্পষ্ট কথা—বন্দরের সম্পদ ব্যক্তিমালিকানাধীন বা বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজে ফিরবেন না।
নিরাপত্তার চাদরে বন্দর এলাকা: সমঝোতার আহ্বান প্রত্যাখ্যান
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন্দর এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সকাল থেকেই বন্দরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে পুলিশের বিশেষ ‘Alert’ বা সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ৪ নম্বর গেট এলাকায় জলকামান (Water Cannon) ও সাঁজোয়া যান (APC) মোতায়েন করে রাখা হয়েছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
এদিকে, সংকট নিরসনে রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে প্রায় ২০০ সাধারণ কর্মচারী ও শ্রমিক প্রতিনিধিকে নিয়ে এক জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ এই বৈঠককে ‘লোক দেখানো’ অভিহিত করে তা বর্জন করেছে। কর্তৃপক্ষের সমঝোতার প্রচেষ্টা আপাতত ব্যর্থ হওয়ায় অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার সংকেত দিচ্ছে।
অর্থনীতিতে অশনিসংকেত: সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানী-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। এক দিনের ধর্মঘট মানেই কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। গার্মেন্টস খাতের কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো দ্রুত এই সংকট সমাধানের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, বন্দরের ‘Operational Efficiency’ বজায় রাখতে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন করা জরুরি, অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে।