• ব্যবসায়
  • ১১ দিনের মজুত ঘিরে শঙ্কা, তবে মাসজুড়েই আসছে সাড়ে তিন লাখ টন জ্বালানি: সংকটের কি অবসান ঘটবে?

১১ দিনের মজুত ঘিরে শঙ্কা, তবে মাসজুড়েই আসছে সাড়ে তিন লাখ টন জ্বালানি: সংকটের কি অবসান ঘটবে?

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
১১ দিনের মজুত ঘিরে শঙ্কা, তবে মাসজুড়েই আসছে সাড়ে তিন লাখ টন জ্বালানি: সংকটের কি অবসান ঘটবে?

পাম্পে দীর্ঘ সারি আর সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের মাঝে আশার কথা শোনাল জ্বালানি বিভাগ; বিকল্প উৎস থেকে আমদানির তোড়জোড় ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে দেশের জ্বালানি তেলের মজুত নেমে এসেছে মাত্র ১০ থেকে ১১ দিনে। রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যখন নিত্যদিনের চিত্র, তখন স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। সরকারি তথ্যমতে, চলতি এপ্রিল মাসেই পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে দেশে পৌঁছাবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিকল্প উৎস থেকেও তেল আমদানির বিষয়ে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে। সরকারের দাবি, এই সরবরাহ নিশ্চিত হলে এপ্রিলে কোনো ধরনের বড় সংকটের মুখে পড়বে না দেশ, বরং মাসের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে পর্যাপ্ত তেল।

পাম্পে ভোগান্তি ও সাধারণ মানুষের হাহাকার সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এক অস্বস্তিকর চিত্র। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালক এবং রাইডশেয়ারিং সার্ভিসের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের জীবিকায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। চালকরা অভিযোগ করছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র কয়েক লিটার তেল মেলায় দিনের বড় একটা সময় নষ্ট হচ্ছে, যা সরাসরি তাদের দৈনন্দিন উপার্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক চাকরিজীবী সময়মতো অফিসে বা ক্লায়েন্টের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি করছে।

মজুত পরিস্থিতির বর্তমান চালচিত্র মার্চ মাসের শেষে জ্বালানি তেলের মজুত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে ১০ থেকে ১১ দিনের। এছাড়া অকটেন মজুত আছে মাত্র ৬ থেকে ৭ দিনের এবং পেট্রোলের মজুত দিয়ে বড়জোর ৮ থেকে ৯ দিন চলা সম্ভব। এই পরিসংখ্যান জনমনে শঙ্কা তৈরি করলেও জ্বালানি বিভাগ বলছে, এটি সাময়িক এবং পাইপলাইনে থাকা নতুন চালানগুলো পৌঁছালেই পরিস্থিতি আমূল বদলে যাবে।

সরবরাহ নিশ্চিতে সরকারের মাল্টি-সোর্স পরিকল্পনা দেশের Energy Security নিশ্চিত করতে সরকার কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর নির্ভর না করে আমদানির উৎস বহুমুখী করার কৌশল নিয়েছে। জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী:

কাজাখস্তান থেকে ১ লাখ টন ডিজেল আমদানির বিষয়টি ইতিমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া থেকে আসবে ৬০ হাজার টন এবং ভারত থেকে পাইপলাইন ও অন্যান্য মাধ্যমে আসবে আরও ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় ১ লাখ টন Crude Oil বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আসার কথা রয়েছে।

এছাড়াও সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিকল্প বাজারগুলো থেকেও আমদানির বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনটি অপরিশোধিত তেলের জাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে লোডিং অবস্থায় রয়েছে। হরমুজ প্রণালির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপদ যাতায়াতের (Green Signal) ওপর ভিত্তি করে সেগুলো দ্রুতই দেশে পৌঁছাবে। অকটেনের চাহিদা মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৩০০ টন এবং আমদানি করা ৫০০ মেট্রিক টন—মোট ৮০০ মেট্রিক টন অকটেনের সংস্থান করা হয়েছে, যা দিয়ে আগামী দুই মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞের চোখে আস্থার সংকট ও ‘প্যানিক বায়িং’ জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে সংকটের মূল কারণ তেলের অভাব নয়, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থার সংকট। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “বাজারে এক ধরনের Panic Buying বা আতঙ্কে অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। সরকার বারবার আশ্বস্ত করলেও মানুষ কেন পাম্পে ভিড় করছে, সেই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করা জরুরি।” তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী বা শীর্ষ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারকদের সরাসরি বার্তার মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করা প্রয়োজন যে পেট্রোল ও অকটেনের কোনো বাস্তব ঘাটতি নেই।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরামর্শ চলমান পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষজ্ঞরা স্বল্পমেয়াদী আমদানির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন। অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমানো এবং ডিমান্ড সাইড ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। সরকার যদি Supply Chain বা সরবরাহ শৃঙ্খলায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে এবং সঠিক সময়ে আমদানিকৃত তেল ফিলিং স্টেশনগুলোতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়, তবে এপ্রিল মাসেই জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Tags: bangladesh economy energy news energy security fuel crisis oil supply crude oil panic buying diesel import fuel reserve octane shortage