মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর এসব কথা বলেন। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে কারফিউ দিয়ে গণহত্যায় উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন সূচনা বক্তব্যে তিনি এই বক্তব্য তুলে ধরেন।
তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে বলেন, এ মামলার প্রধান দুই আসামি হলেন— সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ-বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এর মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন সালমান এফ রহমান। আর আইন রক্ষার শপথ নিয়েও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে আইনি ও নীতিগত প্রশ্রয় দিয়েছেন সাবেক এই আইনমন্ত্রী।
তদন্তে পাওয়া তথ্যপ্রমাণ প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলন দমনের নীলনকশা প্রণয়ন করেন তারা। সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে প্রাণঘাতী অস্ত্র, দেখামাত্র গুলির নির্দেশনা, হেলিকপ্টার থেকে গুলি বর্ষণসহ গ্রেফতার-নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, জুলাই-আগস্টে হত্যাযজ্ঞ ছিল পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত, লক্ষ্যভিত্তিক ও ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত। এটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় ক্যাডার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয়ে পরিচালিত একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের ফল। এই অপরাধের লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করা। এই অপরাধ কেবল কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়নি— এটি একটি জাতির স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। আমরা প্রমাণাদির মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে এসব প্রমাণ করবো।
‘রংপুরে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ গোপন করে ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য প্রশাসনিকভাবে চাপ প্রয়োগ করেন আসামি সালমান এফ রহমান। বিশেষভাবে ১৯ জুলাই কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন আসামিদ্বয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গণভবনে বৈঠক হয়। এরপর সেনা মোতায়েনসহ দেশব্যাপী কারফিউ জারি করা হয়, যা হত্যাযজ্ঞকে আরও ত্বরান্বিত করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০ ও ২৮ জুলাই এবং ৪ ও ৫ আগস্টও হত্যাযজ্ঞ থামেনি। হত্যাযজ্ঞের অংশ হিসেবে মিরপুরে সিফাত হাওলাদার, আখতারুজ্জামান, শাহরিয়ার আলভীসহ একের পর এক তরুণ প্রাণ হারান। শুধু ২০ জুলাই অন্তত ২০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তাজুল ইসলাম বলেন, এ মামলায় ২৮ জন সাক্ষী উপস্থাপন করবে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে রয়েছেন– আহত ভুক্তভোগী, প্রত্যক্ষদর্শী, স্বজন, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও তদন্ত কর্মকর্তা। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক দালিলিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ, জব্দ তালিকা, আলামত, বিশেষজ্ঞ মতামত, বই এবং পদ্ধতিগত চরিত্রকে অকাট্যভাবে প্রমাণ করা হবে। তাই এই আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন শহীদদের আত্মা। আহতরা অপেক্ষা করছেন রাষ্ট্রীয় অপরাধের স্বীকৃতির। আর ট্রাইব্যুনালের ন্যায়বিচারের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে বলে প্রত্যাশা করছে গোটা জাতি।
পরে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি দিন নির্ধারণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে সকালে এ মামলায় গ্রেফতার দুই আসামিকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের উপস্থিতিতেই মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন।
গত ১২ জানুয়ারি সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়। ওই দিন নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায়বিচার চান আসামিরা।
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে বলা হয়, জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন সালমান ও আনিসুল। এর প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ফোনে কথা বলেন তারা। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় বহু ছাত্র-জনতার প্রাণহানি ঘটলেও নির্যাতন বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এছাড়া ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই মিরপুরে হত্যাকাণ্ড, ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ এ মারণাস্ত্র ব্যবহার, ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এ ১২ জন এবং ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘিরে মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনাকে তাদের পরিকল্পনা ও নির্দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর এসব অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১। একই দিন ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।