জাতীয় নির্বাচনের মাহেন্দ্রক্ষণের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে শরীয়তপুরের নড়িয়ায় চাঞ্চল্যকর এক অভিযানে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থসহ এক ব্যক্তিকে আটক করেছে যৌথ বাহিনী। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নড়িয়া পৌরসভার দক্ষিণ বৈশাখীপাড়া এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর একটি অস্থায়ী নির্বাচনী কার্যালয়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে নগদ ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা উদ্ধারের পাশাপাশি ‘নির্বাচনী আচরণবিধি’ (Election Code of Conduct) লঙ্ঘনের দায়ে একজনকে কারাদণ্ড প্রদান করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
যৌথ বাহিনীর হানা ও গোপন নথিপত্র উদ্ধার
স্থানীয় প্রশাসন ও যৌথ বাহিনীর (Joint Forces) সূত্রমতে, নির্বাচনে অবৈধভাবে টাকা বিলিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে—এমন একটি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নড়িয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ওই কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে নগদ ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা, একটি ল্যাপটপের হার্ডডিস্ক এবং টাকা বিতরণের একটি বিস্তারিত তালিকা উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই অর্থ মূলত নির্বাচনের দিন ‘ভোট কেনা’ বা ‘Voter Influence’ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে মজুত করা হয়েছিল।
পোলিং অফিসারের বিতর্কিত ভূমিকা ও দণ্ডাদেশ
এই ঘটনায় সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো আটক হওয়া ব্যক্তির পরিচয়। দণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম মোস্তফা ১২৭ নম্বর হাজী সৈয়দ আহম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, তিনি আসন্ন নির্বাচনে একটি ভোটকেন্দ্রে ‘পোলিং অফিসার’ (Polling Officer) হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনীত ছিলেন। একজন সরকারি কর্মচারী এবং নির্বাচনী পদের অধিকারী হয়েও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে তার উপস্থিতি ও বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
ঘটনাস্থলেই নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারক কমিটির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুজন মিয়ার উপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত (Mobile Court) বসানো হয়। যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য গ্রহণের পর গোলাম মোস্তফাকে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। রায়ের পরপরই নড়িয়া থানা পুলিশ তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করে।
রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
অভিযান প্রসঙ্গে নড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস জানান, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই আমরা সেখানে অভিযান চালিয়েছি। টাকা বিতরণের তালিকা এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ নির্বাচনী স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি।”
এদিকে, শরীয়তপুর-২ আসনের জামায়াত প্রার্থী মাহমুদ হোসেনের মিডিয়া সেলের প্রধান মাসুদ কবির প্রশাসনের এই অভিযানকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন। তার মতে, উদ্ধারকৃত টাকা ১৩৬টি কেন্দ্রের কর্মীদের যাতায়াত ও খাবারের জন্য রাখা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তারা নির্বাচন কমিশনে (Election Commission) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাবেন বলে জানান।
অন্যদিকে, এই ঘটনার পর রাতেই বিএনপি প্রার্থী সফিকুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্ন স্থানে অর্থ দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার হীন চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “টাকা দিয়ে জনমত পরিবর্তনের চেষ্টা কখনোই সফল হতে দেওয়া হবে না।”
নির্বাচনী নিরাপত্তা ও জনমনে উদ্বেগ
শরীয়তপুর-২ আসনে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীসহ মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটের আগের রাতে এমন ‘ক্যাশ রিকভারি’ (Cash Recovery) এবং একজন পোলিং অফিসারের সাজা পাওয়ার ঘটনা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরো জেলায় নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা হয়েছে এবং যেকোনো ধরণের ‘ইলেকটোরাল ক্রাইম’ (Electoral Crime) দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।