বিশ্বজুড়ে আলোচিত এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন ‘এপস্টেইন ফাইলস’ নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে এক প্রবল বিতর্ক। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন যে নারকীয় সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, তার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের (Department of Justice) সাম্প্রতিক প্রকাশ করা নথিতে এবার উঠে এসেছে খোদ পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসন এবং রক মিউজিকের আইকন মিক জ্যাগারের নাম। বিনোদন ও রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরে থাকা ব্যক্তিদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তি বিশ্বব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
নতুন নথিতে নক্ষত্রদের সমাগম: কে নেই এই তালিকায়?
পাম বন্ডি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এপস্টেইন ফাইলসের একটি বিশাল অংশ সম্প্রতি জনসমক্ষে আনা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, জেফ্রি এপস্টেইন ও তার বিতর্কিত সহযোগী গিজলেন ম্যাক্সওয়েলের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ছিলেন বিনোদন জগতের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তিত্ব। এর আগে এই তালিকায় বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, টেসলা প্রধান ইলন মাস্ক এবং মাইক্রোসফটের বিল গেটসের নাম আসলেও, এবারের নতুন প্রকাশনায় বিনোদন জগতের মহারথীদের নাম আসায় শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ।
পাম বিচ হাউসে পপসম্রাট: ঠিক কী ঘটেছিল সেখানে?
প্রকাশিত নথিতে বেশ কিছু আলোকচিত্র পাওয়া গেছে, যা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। একটি ছবিতে মাইকেল জ্যাকসনকে দেখা গেছে ডায়ানা রস এবং বিল ক্লিনটনের সাথে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে এপস্টেইনের পাম বিচ হাউসে মাইকেল জ্যাকসনের উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে। নথির তথ্যানুযায়ী, পপসম্রাট এপস্টেইনের সেই কুখ্যাত বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন।
তবে কি মাইকেল জ্যাকসনও কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? প্রকাশিত নথিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, এসব আলোকচিত্র বা দলিলে মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা (Criminal Activities) এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০১৬ সালের একটি জবানবন্দিতে (Deposition) এক অভিযোগকারী জানিয়েছিলেন যে তিনি এপস্টেইনের বাড়িতে মাইকেল জ্যাকসনকে দেখেছিলেন, তবে পপসম্রাট কোনো অনৈতিক আচরণ করেছেন—এমন কোনো দাবি সেখানে করা হয়নি।
মিক জ্যাগার ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের সমীকরণ
রোলিং স্টোনসের ফ্রন্টম্যান মিক জ্যাগারও বাদ যাননি এই তালিকা থেকে। প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা গেছে, বিল ক্লিনটন ও জেফ্রি এপস্টেইনের সাথে একটি রাজকীয় ডিনারে অংশ নিচ্ছেন তিনি। যদিও জ্যাগারের ক্ষেত্রেও কোনো বেআইনি বা অসামাজিক কাজের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, তবুও এপস্টেইনের মতো একজন ব্যক্তির সাথে জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়া তাঁর ভাবমূর্তিকে এক ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
রাজনীতি ও বিনোদনের রহস্যময় মেলবন্ধন
বিচার বিভাগের এই নথিতে শুধু বিনোদন জগতই নয়, রাজনীতিক বিল ক্লিনটন এবং জনপ্রিয় অভিনেতা ক্রিস টাকারের নাম ও ছবিও পুনর্বার উঠে এসেছে। এপস্টেইনের সেই ব্যক্তিগত দ্বীপ কিংবা বিলাসবহুল বাড়িতে কেন এই হাই-প্রোফাইল (High-profile) ব্যক্তিরা বারবার যেতেন, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহলের শেষ নেই।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তোলপাড়
এই নথিপত্র প্রকাশের পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে কনস্পিরেসি থিওরি (Conspiracy Theory) বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে কোনো সরাসরি অপরাধের প্রমাণ মেলেনি, তবুও জনমনে একটি ধারণা প্রবল হচ্ছে যে, ক্ষমতার অলিন্দে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে এপস্টেইন একটি বিশেষ প্রভাব বলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিচার বিভাগের এই স্বচ্ছতা বা Transparency বজায় রাখার পদক্ষেপটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও, তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের ব্যক্তিজীবনের ওপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
এপস্টেইন মামলার এই নতুন অধ্যায়টি প্রমাণ করে যে, অন্ধকার সাম্রাজ্যের গভীরতা ছিল অনেক বেশি, যার রেশ এখনো কাটেনি বিশ্ববাসীর মন থেকে।