দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইরান। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, ওয়াশিংটনকে অবশ্যই ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা 'Sanctions' তুলে নেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তখত-রাভানচি বিবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনার টেবিলে নমনীয়তা দেখায়, তবে ইরানও একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় আপস বা সমঝোতা করতে প্রস্তুত।
তেহরানের নমনীয় অবস্থান ও নতুন বার্তা মাজিদ তখত-রাভানচি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তাঁর ভাষায়, ‘বল এখন আমেরিকার কোর্টে।’ তিনি আরও যোগ করেন, “তারা (যুক্তরাষ্ট্র) যদি সত্যিকার অর্থেই আন্তরিক হয়, তবে আমি নিশ্চিত আমরা একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতার পথে এগোতে পারব।” তেহরান মনে করছে, কেবল চাপের মুখে নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই একটি দীর্ঘমেয়াদী 'Nuclear Deal' সম্ভব।
ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ও ‘কঠিন’ সমীকরণ তেহরানের এই ইতিবাচক সুরের বিপরীতে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন। স্থানীয় সময় শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মন্তব্য করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চুক্তি করতে আগ্রহী হলেও ইরানের বর্তমান অবস্থানের কারণে সেটি বাস্তবায়ন করা ‘অত্যন্ত কঠিন’ (Very Difficult)। মার্কিন কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আলোচনায় স্থবিরতার জন্য মূলত ইরানের অনমনীয় মনোভাবই দায়ী। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে যেমন আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কড়া নজরদারি ও ভূ-রাজনৈতিক বা 'Geopolitics' কৌশলগত চাপ অব্যাহত রেখেছে।
ওমান থেকে জেনেভা: কূটনীতির নতুন সমীকরণ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে ওমানে দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত গোপনে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দ্বিতীয় দফা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, আলোচনার অগ্রগতি এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক, তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও সময়ের প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এই আলোচনা প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
নেপথ্যে সামরিক উত্তেজনা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা diplomacy বা কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে অঞ্চলটিতে সামরিক উত্তেজনাও চরমে। চুক্তি না হলে ইরানের ওপর হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বা 'Military Presence' ক্রমশ বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে, গত মাসে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার ঝড় বইছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর (Human Rights Organizations) দাবি অনুযায়ী, এই বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যা আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনের জন্য একটি বাড়তি চাপের ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান শেষ পর্যন্ত কতটুকু ছাড় দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিষেধাজ্ঞা বা 'Sanctions' নীতিতে কতটা পরিবর্তন আনবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ। জেনেভার আসন্ন বৈঠকটিই হয়তো ঠিক করে দেবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস বইবে নাকি উত্তেজনার পারদ আরও চড়বে।