• Articles
  • বগুড়া থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে: কোরিয়ান সিনেমার স্বপ্নে বিভোর এক ‘অবাধ্য’ স্বপ্নবাজের গল্প

বগুড়া থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে: কোরিয়ান সিনেমার স্বপ্নে বিভোর এক ‘অবাধ্য’ স্বপ্নবাজের গল্প

১ মিনিট পড়া
বগুড়া থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে: কোরিয়ান সিনেমার স্বপ্নে বিভোর এক ‘অবাধ্য’ স্বপ্নবাজের গল্প

শর্ট ফিল্ম ‘নো ডাইস’-এর আন্তর্জাতিক জয়জয়কার থেকে কোরিয়ান ভাষায় দক্ষতা; পরিচালক ও অভিনেতা সাগর ইসলামের জীবন-দর্শনের অন্দরমহল

বগুড়ার ধুলোবালি মাখা গ্রাম পঁওতা থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ঝলমলে মঞ্চ— এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা কোনো রূপকথা ছিল না। এটি ছিল এক অদম্য কিশোরের জেদ, শিল্পের প্রতি নিঃস্বার্থ টান আর নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার নিরন্তর লড়াই। পঁওতা থেকে ইতালি কিংবা নেপালের রেড কার্পেটে পদচিহ্ন রাখা সেই লড়াকু শিল্পীর নাম সাগর ইসলাম। তিনি একাধারে পরিচালক, অভিনেতা এবং একজন কোরিয়ান ভাষা বিশেষজ্ঞ। সম্প্রতি তার জীবন-সংগ্রাম, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রাপ্তি এবং কোরিয়ান চলচ্চিত্রে কাজ করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি মৃধা আলাউদ্দিনের সাথে। সেই আলাপচারিতার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

বগুড়ার ধুলোবালি থেকে সিনেমার রুপালি জগত

সাগর ইসলামের শিল্পের সাথে প্রথম মিতালি ঘটেছিল গ্রামের স্কুল ‘দাড়িদহ উচ্চ বিদ্যালয়ে’। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মজ্জাগত নাট্যপাগল। তখন থেকেই নাটক লেখা, নির্দেশনা দেওয়া আর অভিনয়ের সেই যে ‘ভূত’ মাথায় চেপেছিল, তা আজও নামেনি। স্মৃতির জানালা খুলে সাগর বলেন, “স্কুলের ওই ছোট ছোট মঞ্চগুলোই আসলে আমাকে ভিতর থেকে রি-ডিজাইন করেছে। ওই সময়ই আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আমার গন্তব্য রুপালি পর্দা।”

সিনেমার প্রতি এই তীব্র আকর্ষণ তাকে ঘরছাড়া করেছিল বহুবার। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সাইকেল চালিয়ে বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাটসহ উত্তরবঙ্গের প্রায় ৩০টি সিনেমা হলে ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি। প্রিয় নায়ক মান্নার প্রয়াণ আজও তাকে কাঁদায়। এই ‘মুভি ম্যাডনেস’-এ তার ছায়াসঙ্গী ছিলেন বন্ধু আইনুর। এই দীর্ঘ পথচলা এবং বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অভিনয় ও আবৃত্তিতে স্বর্ণপদক জয়ই তার আত্মবিশ্বাসের ভিত গড়ে দেয়।

টার্নিং পয়েন্ট: ‘নো ডাইস’ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

মঞ্চের ব্যাকরণ শিখে সাগর পা রাখেন চলচ্চিত্র নির্মাণের পিচ্ছিল পথে। তার মতে, মঞ্চ মানুষকে চিনতে শেখায় আর সিনেমা মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে ‘ভিজ্যুয়াল আর্ট’-এ রূপ দেয়। গত বছর তার ক্যারিয়ারের বড় Turning Point ছিল স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘নো ডাইস’ (No Dice) নির্মাণ।

এই শর্ট ফিল্মটি নিয়ে সাগর বলেন, “আমি চেয়েছিলাম মানুষ শুধু একটি দৃশ্যকাব্য না দেখুক, বরং জীবন, অস্তিত্ব আর মানুষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন কোনো বোধের মুখোমুখি হোক।” সেই দর্শনেই বাজিমাত। ইতালিতে দুটি পুরস্কার আর নেপালের আন্তর্জাতিক উৎসবে স্বীকৃতি প্রমাণ করেছে যে শিল্পের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।

কোরিয়ান ভাষার জাদুকর ও ‘কালচারাল ডিপ্লোম্যাসি’

সাগর ইসলামের বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি দিক হলো কোরিয়ান ভাষায় তার অগাধ পাণ্ডিত্য। বিখ্যাত কোরিয়ান সিনেমা ‘ওল্ডবয়’ দেখে সাবটাইটেল ছাড়া সেই সংলাপগুলো বোঝার তাড়না থেকেই এই ভাষা শেখার শুরু। আজ তিনি একজন দক্ষ কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষক। কোরিয়ান দূতাবাস আয়োজিত বক্তব্য প্রতিযোগিতায় দুবার পুরস্কৃত হওয়াকে তিনি তার মেধার অন্যতম বড় স্বীকৃতি মনে করেন।

বর্তমানে তিনি যারা দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা বা চাকরির (Job Placement) জন্য আগ্রহী, তাদের ভাষা শেখাচ্ছেন। সাগরের ভাষায়, “ভাষা শেখানো মানে শুধু শব্দ শেখানো নয়, বরং একটি নতুন সংস্কৃতি আর জীবনধারাকে হৃদয়ে ধারণ করা।”

পরবর্তী গন্তব্য: দক্ষিণ কোরিয়া ও আগামীর স্বপ্ন

সাগরের বর্তমান লক্ষ্য এখন আরও সুদূরপ্রসারী। নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলছেন সরাসরি কোরিয়ান চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য। এই কঠিন যাত্রায় তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার জীবনসঙ্গী কানিজ ফাতেমা জ্যোতি, যিনি বর্তমানে কোরিয়া থেকেই তাকে সব ধরনের লজিস্টিক ও মানসিক সাপোর্ট দিয়ে চলেছেন।

সিনেমার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সাগর বলেন, “সিনিমা আমার কাছে এমন এক জগত, যেখানে মানুষের আদিম ভয়, জটিল প্রশ্ন আর আশা-নিরাশার দ্বৈরথ জীবন্ত হয়ে ওঠে।” নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তার পরামর্শ— “স্বপ্ন দেখতে ভয় পেয়ো না। স্বপ্নের পেছনে ছোটার প্রতিটি মুহূর্তই এক একটি অর্জন।”

বগুড়ার সেই কিশোর আজ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের এক প্রতিশ্রুত নাম। সাগরের এই যাত্রা প্রমাণ করে, মেধা আর একাগ্রতা থাকলে দেশীয় গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা কেবল সম্ভবই নয়, অনিবার্য।

Tags: interview cultural diplomacy acting career international film festival sagar islam bogra director korean cinema no dice short film filmmaker journey bangladeshi talent