রাজনীতিতে উত্তরসূরিদের উঠে আসা নতুন কিছু নয়, তবে ইতিহাসের এমন কাকতালীয় পুনরাবৃত্তি সচরাচর দেখা যায় না। ঠিক ৩৫ বছর আগে ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন নাটোরের প্রভাবশালী নেতা প্রয়াত ফজলুর রহমান পটল। সাড়ে তিন দশক পর বাবার সেই স্মৃতিবিজড়িত মন্ত্রণালয়ের হাল ধরলেন তার সুযোগ্য কন্যা ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী নতুন মন্ত্রিসভায় তাকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও পারিবারিক ঐতিহ্য
১৯৯১ সালের সরকারে ফজলুর রহমান পটল যখন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন সেটি ছিল নাটোরবাসীর জন্য এক গর্বের মুহূর্ত। পরবর্তীতে ২০০১ সালের চারদলীয় জোট সরকারেও তিনি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বাবার সেই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে এবার বড় চমক দেখালেন ফারজানা শারমিন পুতুল। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি কেবল বাবার উত্তরসূরি হিসেবেই নয়, বরং একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবেও দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজের স্থান করে নিলেন।
রাজপথ থেকে মন্ত্রিসভা: ব্যারিস্টার পুতুলের রাজনৈতিক উত্থান
ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল পেশায় একজন আইনজীবী হলেও দীর্ঘদিন ধরে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের ‘Foreign Affairs Advisory Committee’-র বিশেষ সহকারী হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। আন্তর্জাতিক মহলে দলের সংযোগ রক্ষা এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসন থেকে প্রথমবার দলীয় মনোনয়ন পেয়েই বাজিমাত করেছেন তিনি। সরাসরি ভোটে (Direct Election) রাজশাহী বিভাগের মধ্যে একমাত্র নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার অনন্য রেকর্ড গড়েন পুতুল। তার এই বিজয় এবং পরবর্তীতে ‘State Minister’ হিসেবে নিয়োগ পাওয়াকে দলের পক্ষ থেকে ‘Women Empowerment’ বা নারী ক্ষমতায়নের একটি বড় স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দ্বৈত দায়িত্ব ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
নতুন মন্ত্রিসভায় ব্যারিস্টার পুতুলকে কেবল একটি নয়, বরং সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সমাজসেবা, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় সরকারের বিশেষ ভিশন বাস্তবায়নে তাকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ব্যারিস্টার হিসেবে আইনি জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পুতুল এই ‘Portfolio’ সামলাতে যথেষ্ট পারদর্শী হবেন। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় তার থেকে বিশেষ কিছু প্রত্যাশা করছে সাধারণ মানুষ।
লালপুর-বাগাতিপাড়ায় উৎসবের জোয়ার
ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই তার নির্বাচনী এলাকা লালপুর ও বাগাতিপাড়ায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। নেতাকর্মীরা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন এবং আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেন।
স্থানীয় ভোটারদের দাবি, ফজলুর রহমান পটল এই আসনটিকে বিএনপির একটি দুর্ভেদ্য ‘Political Stronghold’ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। উন্নয়নের ছোঁয়ায় তিনি যেভাবে মানুষের মন জয় করেছিলেন, তার মেয়েও একইভাবে এলাকার অবকাঠামো ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নিজেকে বিলিয়ে দেবেন।
বাবার রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণ এবং সরকারের ‘Social Safety Net’ কর্মসূচিগুলোকে আরও বেগবান করাই এখন ব্যারিস্টার পুতুলের সামনে প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সেই একই মন্ত্রণালয়ের করিডোরে যখন এক বাবার মেয়ের পদধ্বনি শোনা যাবে, তখন তা বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক আবেগঘন অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।