পবিত্র রমজান মাসে দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন রোজায় তীব্র গরম ও আর্দ্রতার কারণে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এই অবস্থায় সেহরির খাবার তালিকায় সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সেহরি মূলত শরীরের জন্য ‘ফুয়েল’ বা জ্বালানি হিসেবে কাজ করে, যা আপনার মেটাবলিজম (Metabolism) সচল রাখে এবং দিনভর কাজ করার শক্তি জোগায়। সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকতে সেহরিতে যে পাঁচটি খাবার রাখা অপরিহার্য, তা নিয়ে আমাদের বিশেষ আয়োজন।
১. দীর্ঘমেয়াদী শক্তির উৎস: জটিল শর্করা (Complex Carbohydrates)
সেহরিতে এমন খাবার নির্বাচন করা উচিত যা হজম হতে সময় নেয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে সরবরাহ করে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় জটিল শর্করা বা কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট (Complex Carbohydrates) বলা হয়। সাদা চালের পরিবর্তে লাল চালের ভাত, আটার রুটি, ওটস (Oats) বা বার্লি জাতীয় খাবার সেহরির জন্য আদর্শ। এতে থাকা প্রচুর পরিমাণ ফাইবার (Fiber) পেট ভরা রাখার অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী করে এবং হঠাৎ করে ক্ষুধা লাগার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।
২. পেশি সুরক্ষা ও তৃপ্তিতে প্রোটিন (Protein)
সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে এবং শরীরের টিস্যু মেরামতে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের বিকল্প নেই। সেহরিতে ডিম, ডাল, মুরগির মাংস কিংবা মাছ রাখা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। প্রোটিন হজম হতে দীর্ঘ সময় নেয়, ফলে পেট ভরা থাকে অনেকক্ষণ। এছাড়া যারা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বা পরিশ্রমের কাজ করেন, তাদের পেশি ক্ষয় রোধে হাই-প্রোটিন ডায়েট (High-Protein Diet) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩. হাইড্রেশন বজায় রাখতে ফল ও সবজি
রোজায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন (Dehydration) রোধ করা। এজন্য সেহরিতে পানি জাতীয় ফল ও সবজি যেমন—শসা, টমেটো, লাউ, আপেল, কলা কিংবা তরমুজ রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এসব খাবারে প্রাকৃতিক ভিটামিন ও খনিজের (Minerals) পাশাপাশি প্রচুর পানি থাকে, যা দীর্ঘ সময় শরীরে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে কলায় থাকা পটাশিয়াম শরীরের ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স ঠিক রাখে।
৪. হজম ও ক্যালসিয়ামের জন্য দুগ্ধজাত খাবার
সেহরির শেষ পাতে এক গ্লাস দুধ বা এক বাটি টক দই শরীরের জন্য ‘সুপারফুড’ হিসেবে কাজ করতে পারে। দইয়ে থাকা প্রোবায়োটিকস (Probiotics) হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করে। এছাড়া দুধ ক্যালসিয়ামের একটি চমৎকার উৎস, যা রোজায় হাড় ও দাঁতের সুরক্ষা দেয় এবং শরীরকে সতেজ রাখে।
৫. এনার্জি বুস্টার হিসেবে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (Healthy Fats)
অনেকেই চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলেন, কিন্তু সেহরিতে সামান্য পরিমাণে স্বাস্থ্যকর চর্বি বা হেলদি ফ্যাট (Healthy Fats) থাকা জরুরি। বাদাম, আখরোট, চিয়া সিড কিংবা রান্নায় সামান্য অলিভ অয়েল (Olive Oil) ব্যবহার করলে তা শরীরে টেকসই শক্তি (Sustained Energy) সরবরাহ করে। এটি মস্তিস্কের কার্যকারিতা সচল রাখতে এবং মেজাজ ফুরফুরে রাখতেও সহায়ক।
সেহরিতে যা এড়িয়ে চলা আপনার জন্য জরুরি
১. অতিরিক্ত ভাজাপোড়া: তেলযুক্ত খাবার বা ডিপ ফ্রাইড ফুড (Deep Fried Food) বুক জ্বালাপোড়া এবং অ্যাসিডিটির প্রধান কারণ। ২. চিনি ও লবণ: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার দ্রুত ইনসুলিন বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে পরে খুব বেশি ক্ষুধা লাগে। আবার অতিরিক্ত লবণ তৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়। ৩. ক্যাফেইন (Caffeine): সেহরিতে চা বা কফি পান করলে তা শরীর থেকে পানি বের করে দেয় (Diuretic effect), যা দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করতে পারে।
রমজানের পবিত্রতা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সেহরিতে পরিমিত এবং পুষ্টিকর খাবারের সমন্বয় আপনার রোজা রাখাকে সহজ ও আনন্দদায়ক করে তুলবে।