পবিত্র রমজান মাস সমাগত। সিয়াম সাধনার এই মাসে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জীবনযাত্রায় আসে এক বিশাল পরিবর্তন। দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকার ফলে শরীরের মেটাবলিজম (Metabolism) বা বিপাক প্রক্রিয়ায় বড় ধরণের প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে প্রথম কয়েক রোজায় খাদ্যাভ্যাস এবং ঘুমের সময় বদলে যাওয়ায় অনেকেই শারীরিক দুর্বলতা ও হজমের সমস্যায় ভোগেন। তাই শরীরকে ইবাদতের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করার পাশাপাশি শারীরিকভাবে ফিট রাখা অত্যন্ত জরুরি।
প্রাক-রমজান প্রস্তুতি: শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল
ডায়েটেশিয়ানদের মতে, রোজা শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই শরীরকে নতুন নিয়মের সাথে অভ্যস্ত করা উচিত। হঠাৎ করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে ডায়েটে পুষ্টিকর খাবার যেমন—ডিম, রঙিন শাকসবজি এবং দুধ যোগ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের প্রচুর চা বা কফি পানের অভ্যাস রয়েছে, তাদের উচিত এখনই ক্যাফেইন (Caffeine) গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনা। অন্যথায় রোজার শুরুর দিকে তীব্র মাথাব্যথা বা মাইগ্রেনের সমস্যা হতে পারে। এছাড়াও অতিরিক্ত নোনতা খাবার ডায়েট থেকে বাদ দেওয়া উচিত, কারণ লবণ শরীর থেকে পানি শুষে নিয়ে তৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়।
সেহরি ও ইফতারে সুষম খাবারের গুরুত্ব
রমজানে কর্মক্ষম থাকার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আপনার সেহরি ও ইফতারের খাদ্যতালিকায়। প্রথম কয়েক দিনের ধকল সইতে নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি:
১. প্রোটিন ও ফাইবারের সমন্বয়: সেহরিতে এমন খাবার নির্বাচন করুন যা হজম হতে সময় নেয় এবং দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগায়। ওটস, লাল চালের ভাত, প্রোটিন (Protein) সমৃদ্ধ মাছ বা মাংস এবং প্রচুর ফাইবার (Fiber) যুক্ত সবজি এক্ষেত্রে সেরা বিকল্প।
২. স্মার্ট হাইড্রেশন (Hydration): ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়টাতে পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত করতে হবে। শুধু পানি পান করতে ভালো না লাগলে ডাবের পানি বা চিনির বিকল্প হিসেবে ফলের টাটকা রস পান করা যেতে পারে। এটি শরীরের ইলেকট্রোলাইট (Electrolyte) ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
বর্জনীয় খাবার: যা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়
ইফতারের টেবিলে ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবারের আধিক্য আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত এবং চিনিযুক্ত খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করে। বিশেষ করে ট্রান্স ফ্যাট (Trans Fat) সমৃদ্ধ খাবার বদহজম ও বুক জ্বালাপোড়ার প্রধান কারণ। তাই প্রথম কয়েক রোজায় ভাজাপোড়া কমিয়ে ফলমূল ও সহজপাচ্য খাবারের ওপর জোর দেওয়া উচিত।
শারীরিক সুস্থতা ও বিশ্রাম
প্রথম কয়েক রোজায় শরীরের এনার্জি লেভেল (Energy Level) কিছুটা কম থাকতে পারে। তাই অলসতা বা দুর্বলতা কাটাতে দুপুরে ২০-৩০ মিনিটের হালকা বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। তবে রোজা রেখে প্রথম দিকেই জিমে গিয়ে ভারী ব্যায়াম বা হাই-ইনটেনসিটি কার্ডিও এড়িয়ে চলাই ভালো। শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার সময় দিতে হবে। ইফতারের পর হালকা হাঁটাহাঁটি রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হওয়া
রোজার প্রথম সপ্তাহে শরীর এক ধরণের ‘ডিটক্স’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এই সময় মাথাব্যথা বা সাময়িক ক্লান্তি খুব স্বাভাবিক। তাই ঘাবড়ে না গিয়ে পর্যাপ্ত ঘুম এবং সঠিক পুষ্টির দিকে নজর দিন। হঠাৎ সব ধরণের খাবার বন্ধ না করে বরং পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন, যাতে আপনার শরীর দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার শক্তি পায়। মনে রাখবেন, সঠিক নিয়ম ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই পারে আপনার সিয়াম সাধনাকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলতে।