এশিয়ার অন্যতম ও দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি কেবল মৎস্য ও কৃষির জন্য নয়, বরং এর বৈচিত্র্যময় জলজ বনের জন্যও এক সময় বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। প্রায় ১৮ হাজার ১৫০ হেক্টর আয়তনের এই হাওরে ছোট-বড় ২৩৬টি বিল রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য এবং অসচেতনতায় উজাড় হয়েছে হিজল-করচের বিশাল বন। তবে সেই হারানো দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে এখন নেওয়া হয়েছে বিশেষ বনায়ন প্রকল্প।
বিপন্ন বনাঞ্চল ও ঐতিহ্যের ক্ষয় হাওরপাড়ের প্রবীণদের মতে, ৩০-৪০ বছর আগেও হাকালুকির বন ছিল পাহাড়ি জঙ্গলের মতো ঘন। সেখানে মেছো বাঘ, শিয়াল ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বাস ছিল। এই বনের গাছের নিচেই মাছেরা নিরাপদ আশ্রয়ে ডিম পাড়ত। কিন্তু ১৯৯৯ সালে হাকালুকিকে 'পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' ঘোষণা করার পরেও বন নিধন থামেনি। ২০২১ সালে বাঁধ নির্মাণের অজুহাতে একটি বিল থেকেই প্রায় ২০ হাজার গাছ কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নবপল্লব প্রকল্পের ইতিবাচক প্রভাব হাওরের এই সংকটময় মুহূর্তে বেসরকারি সংস্থা 'সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ' (সিএনআরএস) বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারে এগিয়ে এসেছে। ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে বিগত কয়েক বছরে হাওরে প্রায় ৫০ হাজার হিজল, করচ ও বরুন গাছ রোপণ করা হয়েছে। সংস্থার 'নবপল্লব প্রকল্পের' অধীনে পাহারাদার নিয়োগ দেওয়ায় এখন আর চাইলেই কেউ গাছ কাটতে পারছে না।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও মাছের অভয়াশ্রম হাকালুকি হাওর শীতকালে সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া ও তিব্বত থেকে আসা অতিথি পাখিদের প্রধান বিচরণস্থল। জলজ বন পুনর্গঠিত হলে এই পাখিদের সংখ্যা যেমন বাড়বে, তেমনি মাছের নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্রও তৈরি হবে। প্রকল্পের ফিল্ড ম্যানেজার মো. তৌহিদুর রহমান জানান, তদারকির অভাবে এক সময় হাওরের জলজ বন উজাড় হলেও নতুন বনায়ন কার্যক্রমের সফলতায় ধীরে ধীরে ঐতিহ্য ফিরছে।
প্রশাসনের সমর্থন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহি উদ্দিন এই উদ্যোগের প্রশংসা করে জানান, হাকালুকির পরিবেশ রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার এই কার্যক্রম অত্যন্ত ইতিবাচক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহারাদার নিয়োগসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। তবে পরিবেশবাদী সংগঠকরা মনে করছেন, রোপণ করা গাছগুলো যাতে কেউ কাটতে না পারে, সে ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।