প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে আছে সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি। গ্রাম-বাংলার আনাচে-কানাচে অযত্নে বেড়ে ওঠা 'থানকুনি পাতা' (Centella Asiatica) তেমনই এক বিস্ময়কর উদ্ভিদ। এক সময় বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা যেকোনো শারীরিক অসুস্থতায় এই পাতার ওপর ভরসা রাখতেন। আধুনিক জীবনযাত্রায় আমরা ভেষজ চিকিৎসা থেকে দূরে সরে এলেও, পুষ্টিবিদ ও গবেষকরা বর্তমানে থানকুনি পাতাকে 'সুপারফুড' হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) বাড়াতে এই পাতার জুড়ি মেলা ভার।
সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টের প্রাকৃতিক সমাধান ঋতু পরিবর্তনের সময় সর্দি-কাশি বা জ্বরের সমস্যায় থানকুনি পাতা অত্যন্ত কার্যকরী। বিশেষ করে মধুর সঙ্গে এই পাতার রস মিশিয়ে খেলে ফুসফুসের প্রদাহ কমে এবং শ্বাসযন্ত্রের (Respiratory System) সমস্যা দূর হয়। তুলসি পাতা ও গোলমরিচের সঙ্গে থানকুনি পাতার রস সেবন করলে দ্রুত জ্বর সেরে যায়। এছাড়া যারা দীর্ঘস্থায়ী খুসখুসে কাশিতে ভুগছেন, তাদের জন্য সামান্য চিনির সঙ্গে এই পাতার রস মিশিয়ে খাওয়া দারুণ ফলদায়ক।
হজমের সমস্যা ও আমাশয় নিরাময়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাঙালিদের চিরচেনা পেটের সমস্যা বা বদহজমের মহৌষধ হলো থানকুনি পাতা। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় নিয়মিত এই পাতার রস খেলে অন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ে। এমনকি ক্রনিক আমাশয় (Chronic Dysentery) ও আলসার (Ulcer) নিরাময়েও এর জাদুকরী ক্ষমতা প্রমাণিত। নিয়মিত ডায়েটে থানকুনি পাতা রাখলে হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয় এবং শরীর থেকে টক্সিন বের হয়ে যায়।
রক্ত সঞ্চালন ও ক্ষত নিরাময়ে জাদুকরী প্রভাব শরীরের কোনো স্থানে কেটে গেলে বা আঘাতপ্রাপ্ত হলে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে থানকুনি পাতা বেটে লাগালে তাৎক্ষণিক উপশম পাওয়া যায়। এতে থাকা খনিজ উপাদান রক্ত জমাট বাঁধতে (Blood Clotting) সহায়তা করে। এছাড়া এই ভেষজ রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া (Blood Circulation) স্বাভাবিক রাখে এবং রক্ত বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। থ্রম্বোসিসের মতো সমস্যা প্রতিরোধে এবং শরীরের বিভিন্ন কোষে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছে দিতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। এর ফলে হাত-পা ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা থেকেও মুক্তি মেলে।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও মস্তিষ্কের প্রখরতা বৃদ্ধি বর্তমান সময়ের ব্যস্ত জীবনে মানসিক অবসাদ বা স্ট্রেস (Stress) একটি সাধারণ সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, থানকুনি পাতা শরীরে স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে, যা মানসিক অস্থিরতা ও উদ্বেগ (Anxiety) কমিয়ে প্রশান্তি আনে।
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বা 'ব্রেন পাওয়ার' বৃদ্ধিতে এই পাতার কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত থানকুনি পাতা খেলে শরীরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট (Antioxidant) এবং 'পেন্টাসাক্লিক ট্রিটারপেনস' নামক উপাদানের মাত্রা বাড়ে। এটি ব্রেন সেলকে সচল রাখে, ফলে স্মৃতিশক্তি (Memory Power) প্রখর হয় এবং বার্ধক্যজনিত ভুলে যাওয়ার প্রবণতা হ্রাস পায়।
উপসংহার অবহেলিত এই পাতাটি কেবল ভেষজ নয়, বরং এটি একটি জীবনদায়ী উপাদান। তবে যেকোনো ভেষজ নিয়মিত খাওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, বিশেষ করে যাদের দীর্ঘস্থায়ী কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে। প্রকৃতির এই অনন্য দানকে কাজে লাগিয়ে আপনিও ফিরতে পারেন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়।