রসনা তৃপ্তিতে তেঁতুলের জুড়ি মেলা ভার। চাটনি, আচার কিংবা রান্নায় স্বাদ বাড়াতে এই টক ফলটি যুগ যুগ ধরে আমাদের খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। তবে তেঁতুল কেবল স্বাদের জন্যই নয়, এর রয়েছে অনন্য সব ঔষধি গুণ (Medicinal Properties)। প্রাচীন আয়ুর্বেদ থেকে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান— সবখানেই তেঁতুলের কার্যকারিতা স্বীকৃত। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। মাত্রাতিরিক্ত তেঁতুল সেবন আপনার শরীরের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তেঁতুলের বহুমুখী স্বাস্থ্যগুণ: কেন খাবেন?
১. ওজন নিয়ন্ত্রণ ও মেটাবলিজম: বর্তমান সময়ে স্থূলতা বা ওবেসিটি একটি বড় সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, তেঁতুল শরীরের অতিরিক্ত মেদ (Body Fat) পোড়াতে সাহায্য করে। এটি রক্তে ভালো কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে এবং ক্ষতিকর এলডিএল (LDL) হ্রাস করে হৃদরোগ ও লিভারের ঝুঁকি কমায়। এর বিশেষ উপাদান শরীরের মেটাবলিজম রেট বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
২. হজমশক্তির উন্নতি: তেঁতুল প্রাকৃতিক ফাইবার (Fiber) সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি একটি চমৎকার ল্যাক্সেটিভ হিসেবে কাজ করে। এতে থাকা ম্যালিক ও টারটারিক অ্যাসিড কোষ্ঠকাঠিন্যের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান দেয় এবং অন্ত্রের গতিবিধি বা গাট হেলথ (Gut Health) উন্নত করে।
৩. লিভারের সুরক্ষা ও ডিটক্সিফিকেশন: লিভারের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে তেঁতুলের নির্যাস দারুণ কার্যকর। এতে থাকা প্রোকিয়ানিন নামক উপাদান লিভারকে ফ্রি র্যাডিকালের হাত থেকে রক্ষা করে। শরীর থেকে টক্সিন বের করে দিতে বা ডিটক্স (Detox) করতে তেঁতুলের রস ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
৪. হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনে ভোগা রোগীদের জন্য তেঁতুল অত্যন্ত উপকারী। উচ্চ পটাশিয়াম ও ফাইবার সমৃদ্ধ এই ফলটি রক্তনালীর ওপর চাপ কমিয়ে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: তেঁতুলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (Antioxidant)। যা সর্দি, কাশি ও ফ্লু-এর মতো সংক্রমণ রোধে শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে (Immune System) শক্তিশালী করে তোলে। এমনকি ক্যানসার কোষ ধ্বংসেও এর নির্দিষ্ট ভূমিকা নিয়ে গবেষণা চলছে।
সতর্কতা: তেঁতুলের ক্ষতিকর দিকগুলো কী কী?
উপকারিতা থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তেঁতুল এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
দাঁতের এনামেলের ক্ষতি: তেঁতুলে থাকা উচ্চমাত্রার টারটারিক অ্যাসিড দাঁতের এনামেল (Tooth Enamel) ক্ষয় করতে পারে। অতিরিক্ত তেঁতুল খেলে দাঁত টকে যাওয়া বা শিরশিরানি সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
রক্তচাপ ও সুগার লেভেলের পতন: যারা নিয়মিত রক্তচাপ কমানোর ওষুধ খান, তাদের অতিরিক্ত তেঁতুল খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। এটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে (Hypoglycemia), যা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অ্যালার্জি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: অনেকের ক্ষেত্রে তেঁতুল খাওয়ার ফলে ত্বকে ফুসকুড়ি, চুলকানি বা শ্বাসকষ্টের মতো অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন (Allergic Reaction) দেখা দিতে পারে।
রক্তপাত বৃদ্ধি: নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের সঙ্গে তেঁতুলের বিক্রিয়া ঘটে শরীরে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে তেঁতুল এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
উপসংহার পুষ্টিবিদদের মতে, যেকোনো খাবারের গুণাগুণ বজায় থাকে তার পরিমিত সেবনে। তেঁতুল আপনার ডায়েটে (Diet) অন্তর্ভুক্ত করার আগে আপনার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করুন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী বা যারা নিয়মিত কোনো ক্রনিক রোগের ওষুধ খাচ্ছেন, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তবেই এটি গ্রহণ করুন।