• জীবনযাপন
  • স্কুল ফোবিয়া: নিছক জেদ নাকি মানসিক সংকট? জেনে নিন আপনার সন্তানকে সুস্থ ধারায় ফেরানোর উপায়

স্কুল ফোবিয়া: নিছক জেদ নাকি মানসিক সংকট? জেনে নিন আপনার সন্তানকে সুস্থ ধারায় ফেরানোর উপায়

জীবনযাপন ১ মিনিট পড়া
স্কুল ফোবিয়া: নিছক জেদ নাকি মানসিক সংকট? জেনে নিন আপনার সন্তানকে সুস্থ ধারায় ফেরানোর উপায়

স্কুলে যাওয়ার নাম শুনলেই কি শিশুর পেটব্যথা বা কান্নাকাটি শুরু হয়? শারীরিক অসুস্থতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর মানসিক উদ্বেগ ও 'স্কুল রিফিউজাল' নিয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ।

নতুন জুতা, নতুন বইয়ের ম ম গন্ধ আর বন্ধুদের সঙ্গে টিফিনের হইহুল্লোড়—স্কুল বললেই আমাদের মানসপটে এমন এক আনন্দময় ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অনেক শিশুর কাছে এই ‘স্কুল’ শব্দটিই যেন এক চরম আতঙ্কের নাম। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ পেটব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা অঝোর ধারায় কান্নাকাটি—এসবই অনেক সময় সাধারণ জেদ মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর এক মানসিক জটিলতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘স্কুল রিফিউজাল’ (School Refusal) বা ‘স্কুল ফোবিয়া’ (School Phobia)। এটি কোনো অবহেলা করার মতো বিষয় নয়, বরং শিশুর বিকাশের পথে এক বড় অন্তরায়।

শিশুর মধ্যে যেসব ‘অ্যালার্মিং’ লক্ষণ থাকে

সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছর এবং ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানের আচরণে নিচের পরিবর্তনগুলো দেখলেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন:

শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত: স্কুলে যাওয়ার আগমুহূর্তে শিশু মাথাব্যথা বা পেটের সমস্যার কথা বলে, কিন্তু স্কুল ছুটির সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।

আবেগীয় পরিবর্তন: স্কুলে যাওয়ার কথা শুনলেই অতিরিক্ত কান্না করা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া কিংবা মা-বাবাকে আঁকড়ে ধরে রাখার তীব্র প্রবণতা।

শারীরিক প্রতিক্রিয়া: অনেক সময় ভয়ের চোটে শিশুর বুক ধড়ফড় করে এবং সে অতিরিক্ত ঘামতে শুরু করে।

নিদ্রাহীনতা: স্কুলের দুশ্চিন্তায় রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে না পারা কিংবা ঘুমের মধ্যে ভয়াবহ কোনো দুঃস্বপ্ন (Nightmare) দেখা।

কেন এই ভীতি? কারণ যখন বহুমুখী

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ২ থেকে ৫ শতাংশ শিশু জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই স্কুল ফোবিয়ায় ভোগে। এর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করে:

১. বিচ্ছিন্নতা বোধের উদ্বেগ (Separation Anxiety): অনেক শিশু মনে করে সে স্কুলে গেলে বাড়িতে তার প্রিয়জনদের কোনো বড় বিপদ হতে পারে। মা-বাবার কাছ থেকে দূরে থাকার এই ভয় তাদের স্কুলে যাওয়ার উৎসাহ কমিয়ে দেয়। ২. পরিবেশগত চাপ (Environmental Stress): বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার যুগে পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, কোনো কঠোর শিক্ষকের শাসন কিংবা সহপাঠীদের হাতে ‘বুলিং’ (Bullying) হওয়ার শিকার হওয়া শিশুর মনে স্থায়ী ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। ৩. সামাজিক উদ্বেগ (Social Anxiety): বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে বন্ধুরা কী ভাবছে কিংবা ক্লাসে ভালো পারফর্ম করতে না পারার ভয় থেকে স্কুল পালানোর প্রবণতা বা ‘অ্যাঞ্জাইটি ডিজঅর্ডার’ (Anxiety Disorder) তৈরি হয়। এ ছাড়া পরিবারের অভ্যন্তরীণ কলহ, নতুন ভাইবোনের আগমন বা কোনো প্রিয়জনের অসুস্থতাও শিশুর মনে এই ভীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।

প্রতিকার: কঠোরতা নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা

স্কুল ফোবিয়া কাটিয়ে উঠতে জোরজবরদস্তি কিংবা শাসন কোনো সমাধান নয়। এক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষক—উভয়কেই ‘টিম’ হিসেবে কাজ করতে হবে।

শারীরিক পরীক্ষা: প্রথমে নিশ্চিত হোন শিশুর কোনো প্রকৃত শারীরিক সমস্যা আছে কি না। যদি সব ‘মেডিকেল রিপোর্ট’ স্বাভাবিক থাকে, তবে বুঝতে হবে এটি একটি মানসিক চ্যালেঞ্জ।

আস্থার সম্পর্ক: শিশুর ভয়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাকে ছোট না করে বরং আশ্বস্ত করুন যে তার প্রতিটি সমস্যায় আপনি পাশে আছেন।

ধীরে চলো নীতি: শিশুকে প্রথম দিনেই দীর্ঘ সময়ের জন্য স্কুলে না রেখে শুরুতে মাত্র এক-দুই ঘণ্টার জন্য পাঠান। তার মানসিক অবস্থা বুঝে ধীরে ধীরে সময় বাড়ান।

শিক্ষকের সহযোগিতা: স্কুলের পরিবেশ যেন শিশুর কাছে ভীতিকর না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন?

যদি দেখেন শিশুর এই অস্বাভাবিক আচরণ দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হচ্ছে এবং তার পড়াশোনা কিংবা সামাজিক জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তবে দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Child Psychiatrist) বা ‘চাইল্ড সাইকোলজিস্ট’-এর শরণাপন্ন হোন। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে আপনার সন্তান আবারও সুস্থ ও সাবলীলভাবে পড়াশোনার টেবিলে ফিরে আসবে।

লিখেছেন: ডা. টুম্পা ইন্দ্রাণী ঘোষ শিশু–কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

Tags: child psychology parenting tips mental health health awareness school phobia separation anxiety bullying prevention child psychiatrist education stress school refusal