সকালে এক কাপ গরম চা না হলে যেন দিনটাই শুরু হতে চায় না। কিন্তু গতানুগতিক দুধ-চা বা লিকার চায়ের বাইরে এমন একটি পানীয় এখন বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলেছে, যা কেবল তৃষ্ণাই মেটায় না, বরং শরীরের জন্য এক ‘Superfood’ হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দারুণ জনপ্রিয় এই পানীয়টির নাম ‘ব্লু টি’ (Blue Tea) বা নীল চা, যা তৈরি হয় আমাদের অতি পরিচিত অপরাজিতা ফুল (Butterfly Pea Flower) দিয়ে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এই চায়ের এমন কিছু গুণাগুণ সামনে এসেছে, যা দেখে রীতিমতো চমকে যাচ্ছেন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা।
নীল রঙের আড়ালে লুকিয়ে বিজ্ঞানের ম্যাজিক
অপরাজিতা ফুলের উজ্জ্বল নীল রঙের নেপথ্যে রয়েছে ‘Anthocyanin’ (অ্যান্থোসায়ানিন) নামক এক শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। গবেষকদের মতে, এই উপাদানটি শরীরের কোষের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করে এবং ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিতে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এটি শরীরের ‘Immune System’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এতটাই শক্তিশালী করে তোলে যে, ঋতু পরিবর্তনের সাধারণ রোগবালাই থেকে শুরু করে জটিল সংক্রমণের ঝুঁকিও অনেক কমে যায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও বিপাক প্রক্রিয়ায় বিপ্লব
যারা বাড়তি ওজন বা মেদ নিয়ে চিন্তিত, তাদের জন্য নীল চা হতে পারে এক অব্যর্থ দাওয়াই। এটি শরীরের ‘Metabolism’ বা বিপাক হার বাড়িয়ে দ্রুত ক্যালরি পোড়াতে সাহায্য করে। নিয়মিত এই চা পান করলে লিভারের কার্যকারিতা বাড়ে এবং শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বেরিয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Detoxification’ বলা হয়। ফলে কেবল ওজনই কমে না, বরং হজম ক্ষমতারও আমূল পরিবর্তন ঘটে।
উজ্জ্বল ত্বক ও অকাল বার্ধক্যকে বিদায়
নীল চা কেবল শরীরের ভেতর থেকেই কাজ করে না, এর প্রভাব দৃশ্যমান হয় বাহ্যিক রূপলাবণ্যেও। এতে থাকা অ্যান্টি-গ্লাইকেশন (Anti-glycation) গুণ ত্বককে ঝুলে পড়া থেকে রক্ষা করে এবং বলিরেখা দূর করে। ফলে ‘Anti-aging’ বা অকাল বার্ধক্য রোধে এটি অত্যন্ত কার্যকর। নিয়মিত এই নীল চা পানে ত্বকের প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা বাড়ে এবং চুলের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটে।
বাড়িতে নীল চা বানানোর সহজ পদ্ধতি
এই জাদুকরী চা বানানো যেমন সহজ, তেমনি এর পরিবেশনাও অত্যন্ত নান্দনিক। ১. প্রথমে এক কাপ জল ফুটিয়ে নিন। ২. ফুটন্ত জলে ৪-৫টি শুকনো বা টাটকা অপরাজিতা ফুল দিয়ে দিন। ৩. মিনিট দুয়েক ফুটিয়ে নিলেই জলের রঙ গাঢ় নীল হয়ে আসবে। ৪. স্বাদ বাড়াতে এতে সামান্য মধু বা দারুচিনি যোগ করতে পারেন।
রঙ পরিবর্তনের রসায়ন
নীল চায়ের সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এর ‘pH Level’-এর পরিবর্তন। এই নীল চায়ে যদি কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মেশানো হয়, তবে মুহূর্তের মধ্যেই চায়ের রঙ নীল থেকে বদলে চমৎকার বেগুনি হয়ে যাবে। এটি কেবল দেখতেই সুন্দর নয়, লেবুর ভিটামিন-সি এর পুষ্টিগুণকেও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে এবং শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ রাখতে আজ থেকেই আপনার ডায়েট চার্টে যুক্ত হতে পারে এক কাপ নীল চা। আধুনিক জীবনের স্ট্রেস কমাতে এবং হার্টের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই নীল বিপ্লব আপনার জীবনধারায় আনতে পারে এক ইতিবাচক পরিবর্তন।