আধুনিক জীবনযাত্রার তীব্র প্রতিযোগিতা আর যান্ত্রিকতায় মানসিক চাপ বা Stress এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। পারিবারিক দায়বদ্ধতা কিংবা অফিসের কাজের পাহাড়—সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা গ্রাস করছে সব বয়সীদের। দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ কেবল মনের ওপর নয়, শরীরের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা থেকে উচ্চ রক্তচাপ বা অনিদ্রার মতো সমস্যা তৈরি হয়। তবে স্বস্তির খবর হলো, আমাদের হাতের নাগালে থাকা কিছু খাবার নিয়মিত পাতে রাখলে এই উদ্বেগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
আমেরিকান স্বাস্থ্য সাময়িকী ‘হেলথ লাইন’ (Healthline) এবং পুষ্টিবিদদের মতে, ডায়েট বা খাদ্যতালিকায় সামান্য পরিবর্তন আপনার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে। নিচে এমন ১০টি জাদুকরী খাবারের গুণাগুণ তুলে ধরা হলো:
১. পালংশাক: ম্যাগনেসিয়ামের প্রাকৃতিক উৎস মানসিক চাপের সময় আমাদের শরীরের মাংসপেশিগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এই অবস্থা মোকাবিলায় ‘ম্যাগনেসিয়াম’ (Magnesium) অত্যন্ত কার্যকর। পুষ্টিবিদ ডেভিড নিকোর মতে, পালংশাকের মতো সবুজ শাকে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম থাকে, যা স্নায়ুকে শিথিল করতে এবং ভালো ঘুমে সহায়তা করে। ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হলে শরীরের Cortisol বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
২. গাজর ও আপেল: চিবানোর মাধ্যমে মানসিক মুক্তি শুনতে অবাক লাগলেও সত্য যে, শক্ত খাবার চিবিয়ে খাওয়া আমাদের মানসিক ফোকাস বা মনোযোগ পুনর্নির্দেশিত করতে সাহায্য করে। গাজর বা আপেলের মতো তাজা ফল ও সবজি কামড়ে খাওয়ার ফলে চোয়ালের অনমনীয়তা দূর হয় এবং এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায়, যা সাময়িকভাবে দুশ্চিন্তা কমিয়ে দেয়।
৩. বেরি জাতীয় ফল: অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের ভাণ্ডার ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি বা ব্ল্যাকবেরিতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট (Antioxidants)। এগুলো মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সজীব রাখে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস (Oxidative Stress) থেকে সুরক্ষা দেয়। নিয়মিত বেরি খেলে স্মৃতিশক্তি যেমন বাড়ে, তেমনি মেজাজও ফুরফুরে থাকে।
৪. গ্রিন টি ও ভেষজ চা: স্নায়ুর প্রশান্তি গ্রিন টি অথবা ক্যামোমাইল চায়ের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট গুণাগুণ শরীরের দূষিত পদার্থ বা টক্সিন বের করে দিতে সহায়ক। এটি মস্তিষ্কের আলফা ওয়েভ সক্রিয় করে, যা স্নায়ুকে শান্ত রাখতে এবং তাৎক্ষণিক ক্লান্তি দূর করতে ভূমিকা রাখে।
৫. টক দই: অন্ত্র ও মস্তিষ্কের যোগসূত্র শরীরের ‘গাট হেলথ’ বা অন্ত্রের সুস্থতার সঙ্গে মানসিক অবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। টক দইয়ে থাকা প্রোবায়োটিক (Probiotics) বা উপকারী ব্যাকটেরিয়া শরীরে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। এটি হজম প্রক্রিয়া উন্নত করার পাশাপাশি মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৬. ডার্ক চকোলেট: বিষণ্নতার অব্যর্থ ওষুধ মন খারাপের সময় এক টুকরো ডার্ক চকোলেট জাদুর মতো কাজ করতে পারে। এতে থাকা বিশেষ কিছু ফ্ল্যাভোনয়েড যৌগ মস্তিষ্কে ‘এন্ডোরফিন’ ও ‘সেরোটোনিন’ হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা মুহূর্তেই মানসিক অবসাদ কাটিয়ে আপনাকে উৎফুল্ল করে তোলে।
৭. বাদাম: প্রোটিন ও ওমেগা-৩ এর সমন্বয় কাঠবাদাম, আখরোট কিংবা চিনাবাদামে রয়েছে ভরপুর প্রোটিন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। এর পাশাপাশি এতে থাকা ম্যাগনেসিয়াম মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগগুলোকে সচল রাখে, যা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
৮. ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার: স্নায়ুর রক্ষাকবচ কমলালেবু, আঙুর, লেবু কিংবা বাঁধাকপির মতো ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারগুলো আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্নায়ুকে শান্ত রাখে। এটি স্ট্রেস হরমোন নিয়ন্ত্রণে রেখে শরীরকে সতেজ রাখতে সহায়তা করে।
৯. রসুন: রক্তচাপ ও উদ্বেগের ভারসাম্য রসুনের এলিসিন (Allicin) নামক উপাদান শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। নিয়মিত রসুন সেবনে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। চিকিৎসকদের মতে, রক্তচাপ স্থিতিশীল থাকলে মানসিক অস্থিরতাও অনেকাংশে কমে আসে।
১০. ওটস: হ্যাপি হরমোনের কারখানা সকালের নাস্তায় ওটস রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এটি মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ (Serotonin) নামক এক শক্তিশালী রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে, যা ‘ভালো লাগার’ অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। উচ্চ আঁশযুক্ত এই খাবারটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রেখে মেজাজ খিটখিটে হওয়া থেকে বাঁচায়।
পরিশেষ: খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত শরীরচর্চাও মানসিক চাপ কমানোর জন্য অপরিহার্য। পাশাপাশি স্যালমন মাছ, ডিম, কলা এবং চিয়া সিডও আপনার খাদ্যতালিকায় যোগ করতে পারেন। সুস্থ মন আর সুস্থ শরীরের জন্য সঠিক পুষ্টির বিকল্প নেই।