সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘অ্যালগরিদম’ কি পরিকল্পিতভাবেই শিশুদের আসক্ত করে তুলছে? ইনস্টাগ্রামের চাকচিক্য কি কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করছে? এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াইয়ে এবার সরাসরি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো মেটা-র (Meta) প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে। স্থানীয় সময় বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলসে এক জুরি ট্রায়ালে প্রথমবারের মতো সাক্ষ্য দেন তিনি। প্রযুক্তি বিশ্বের এই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের জবানবন্দিকে ঘিরে বর্তমানে তোলপাড় চলছে বিশ্বজুড়ে।
১৩ বছরের শর্ত বনাম বাস্তব: কাঠগড়ায় জাকারবার্গের দাবি
শুনানির শুরু থেকেই বাদী পক্ষের আইনজীবী মার্ক ল্যানিয়ার জাকারবার্গকে তাঁর প্ল্যাটফর্মের নীতি নিয়ে আক্রমণ করেন। জাকারবার্গ বারবার দাবি করেন যে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম শিশুদের জন্য তৈরি নয় এবং ১৩ বছরের কম বয়সিদের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে আদালতের সামনে মেটার বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ নথি (Internal Documents) উপস্থাপন করা হয়, যা জাকারবার্গের দাবিকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।
নথিতে দেখা যায়, ১৩ বছরের কম বয়সি বিশাল সংখ্যক শিশু নিয়মিতভাবে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করছে এবং মেটা কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে অবগত থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো ‘User Verification’ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ২০২৪ সালে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া জাকারবার্গের আগের বক্তব্যের সূত্র ধরে ল্যানিয়ার প্রশ্ন তোলেন—মুনাফা লাভের নেশায় কি জেনেশুনেই শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয়েছে?
মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয়: মুনাফা বনাম নৈতিকতা
এই মামলার মূল উৎস ক্যালিফোর্নিয়ার এক তরুণীর অভিযোগ। তাঁর দাবি, শৈশবে ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে আসক্ত হয়ে পড়ার কারণে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের (Mental Health) চরম অবনতি ঘটেছে। বাদী পক্ষের অভিযোগ, সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো তাদের ‘User Interface’ এমনভাবে ডিজাইন করেছে যাতে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে আটকে থাকে, যা শিশুদের মধ্যে ‘Social Media Addiction’ বা আসক্তি তৈরি করে।
জাকারবার্গ অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় মেটা নিয়মিত নতুন নতুন সিকিউরিটি ফিচার যুক্ত করছে। মেটার আইনজীবীরা ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন যে, সোশ্যাল মিডিয়া সরাসরি শিশুদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়—এমন কোনো ‘অকাট্য প্রমাণ’ এখনও মেলেনি। উল্টো তারা দাবি করেন, অভিযোগকারী তরুণীর মানসিক সমস্যার মূলে ছিল তাঁর পারিবারিক কলহ, আর ইনস্টাগ্রাম বরং তাঁর জন্য সৃজনশীলতা প্রকাশের একটি মাধ্যম ছিল।
একটি ‘টেস্ট কেস’ এবং প্রযুক্তি বিশ্বের ভবিষ্যৎ
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার এই মামলাটি কেবল মেটার জন্য নয়, বরং গোটা টেক ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি ‘Test Case’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই মামলায় মেটা হেরে গেলে তাদের বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ বা ‘Financial Penalty’ গুণতে হতে পারে। এর চেয়েও বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, এর ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের আইনি সুরক্ষা বা ‘Legal Immunity’ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যা ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে শুধু মেটা নয়, বরং অ্যালফাবেটের গুগল (Google), স্ন্যাপ (Snap) এবং টিকটকের (TikTok) বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক হাজার মামলা ঝুলে রয়েছে। অনেক স্কুল ও অভিভাবক অভিযোগ করেছেন যে, এই অ্যাপগুলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক ধরণের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট (Mental Health Crisis) তৈরি করেছে।
বৈশ্বিক কড়াকড়ি ও আগামীর পথে
সোশ্যাল মিডিয়ার এই নেতিবাচক প্রভাব রুখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন কঠোর হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও স্পেন ইতিমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ১৪ বছরের কম বয়সিদের জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
জাকারবার্গের এই সাক্ষ্যগ্রহণ কেবল একটি মামলার অংশ নয়, বরং এটি ডিজিটাল যুগে ‘Tech Giants’ বা প্রযুক্তি দানবদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পথে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আদালতের রায় যেদিকেই যাক না কেন, শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট গড়ার বিতর্কটি এই ঘটনার ফলে নতুন করে অক্সিজেন পেল।