নীল আর্মস্ট্রংয়ের সেই ‘বিশাল এক লাফ’-এর পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর চাঁদের দেশে মানুষের আর যাওয়া হয়নি। অবশেষে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও মানুষকে চাঁদের কক্ষপথে পাঠাতে চলেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘আর্টেমিস-২’ (Artemis II) মিশনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করে সংস্থাটি জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৬ মার্চ মহাকাশযানের ‘Launch’ বা উৎক্ষেপণের মাধ্যমে শুরু হতে পারে এই ঐতিহাসিক মহাযাত্রা।
উৎক্ষেপণের মহাপ্রস্তুতি ও ‘ওয়েট ড্রেস রিহার্সাল’ ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের ‘Launch Pad’-এ এখন সাজ সাজ রব। মিশনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নাসা সম্প্রতি সম্পন্ন করেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘Wet Dress Rehearsal’ বা ওয়েট ড্রেস রিহার্সাল। এই প্রক্রিয়ায় বিশালাকৃতির রকেটে প্রায় ৭ লাখ গ্যালন তরল জ্বালানি (Liquid Fuel) ভরে উৎক্ষেপণের একটি পূর্ণাঙ্গ মহড়া চালানো হয়। এর আগে প্রথম দফার মহড়ায় ‘Hydrogen Leak’ বা হাইড্রোজেন লিকের কারণে কিছুটা জটিলতা দেখা দিলেও, দ্বিতীয় দফার পরীক্ষায় প্রকৌশলীরা তা সফলভাবে কাটিয়ে উঠেছেন।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (X) এক পোস্টে জানান, “এই পরীক্ষা ছিল চাঁদের পরিবেশে আমেরিকার প্রত্যাবর্তনের পথে একটি বড় অগ্রগতি।” রকেটের ‘Terminal Count’ বা চূড়ান্ত গণনা প্রক্রিয়া দুবার সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় এখন আত্মবিশ্বাসী বিজ্ঞানীরা।
চাঁদের মাটি নয়, কক্ষপথে প্রদক্ষিণ আর্টেমিস-২ মিশনের লক্ষ্য আপাতত চাঁদের মাটিতে অবতরণ নয়, বরং চাঁদের চারপাশে একটি ‘Figure-Eight’ বা ইংরেজি ৮ আকৃতির পথে প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসা। প্রায় ১০ দিনের এই মিশনে মহাকাশচারীরা চাঁদকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করবেন এবং নাসার তৈরি নতুন প্রজন্মের ‘Orion’ মহাকাশযান ও ‘Space Launch System’ (SLS) রকেটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করবেন। এই মিশনের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই আর্টেমিস-৩ মিশনে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে দীর্ঘস্থায়ী মানব বসতি গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে নাসার।
ঐতিহাসিক চার সারথি অর্ধশতাব্দী পর মানবজাতির এই প্রত্যাবর্তনের সারথি হিসেবে চারজন দক্ষ নভোচারীকে বেছে নিয়েছে নাসা। এই দলে আছেন— কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। উল্লেখ্য, এই মিশনের মাধ্যমে ক্রিস্টিনা কোচ হতে যাচ্ছেন চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছানো প্রথম নারী। এই অভিযাত্রীরা পৃথিবী থেকে মহাকাশের ইতিহাসে সবচেয়ে দূরে ভ্রমণের নতুন ‘World Record’ গড়তে পারেন।
কেনেডি স্পেস সেন্টারে টানটান উত্তেজনা উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত মুহূর্তের মহড়ায় নভোচারীরাও সরাসরি অংশ নিয়েছেন। ওরিয়ন মহাকাশযানের ‘Hatch’ বা প্রবেশপথ বন্ধ করা থেকে শুরু করে ‘Launch Control Center’-এর প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তাঁরা। নাসার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি কেবল একটি যান্ত্রিক পরীক্ষা নয়, বরং মানবজাতির অসীম সাহসের পরীক্ষা। যদিও ৬ মার্চ উৎক্ষেপণের প্রাথমিক তারিখ ধরা হয়েছে, তবে আবহাওয়া বা প্রযুক্তিগত সূক্ষ্ম কারণে এই ‘Schedule’ কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
অ্যাপোলো যুগের অবসানের পর আর্টেমিস মিশন কেবল চাঁদে ফেরাই নয়, বরং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে (Mars) মানুষের পদচিহ্ন রাখার পথে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুরো বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে মার্চের সেই ভোরের দিকে, যখন আগুনের শিখা উড়িয়ে আবারও চাঁদের পথে ডানা মেলবে মানুষ।