বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক (World Heritage Site) সুন্দরবনে নতুন করে দানা বেঁধে ওঠা বনদস্যু বাহিনীর দৌরাত্ম্য নির্মূল করতে কঠোর রণকৌশল গ্রহণ করছে সরকার। সম্প্রতি জেলে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির মতো অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ে চিরুনি অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।
সাঁড়াশি অভিযানের ব্লু-প্রিন্ট
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) খুলনায় আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় সুন্দরবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সভায় বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন, র্যাব (RAB), কোস্ট গার্ড (Coast Guard), পুলিশ ও নৌ-পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বিঘ্ন করতে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।
উদ্বেগজনক অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্য
বিগত দুই বছর সুন্দরবন তুলনামূলক শান্ত থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দস্যু তৎপরতা নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে দুবলার চর ও সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে মাছ ধরারত জেলেদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা, মাছ ছিনতাই এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, সবশেষ এক সপ্তাহেই ২৮ জন জেলেকে অপহরণ করেছে বিভিন্ন দস্যু বাহিনী। অনেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দিয়ে ফিরলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বেশ কয়েকজন। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সাধারণ মৎস্যজীবীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে।
সমন্বিত নিরাপত্তা ও লজিস্টিক সাপোর্ট
প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবন কেবল আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি বাংলাদেশের ফুসফুস (Lungs of Bangladesh)। এই বন রক্ষা করা এবং সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আমরা কেবল চলমান টহল জোরদার করছি না, বরং বনদস্যুদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে একটি বিশেষ অভিযান (Special Operation) পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তিনি আরও যোগ করেন, দস্যুদের সংখ্যা কত সেটি বড় বিষয় নয়; বরং তাদের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ধ্বংস করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে বন বিভাগের বিদ্যমান লজিস্টিক সাপোর্ট (Logistic Support) এবং জনবল সংকটের বিষয়টিও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করছে মন্ত্রণালয়। দ্রুতই আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন জলযান ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে বনরক্ষীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিতের অঙ্গীকার
উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যেন নির্ভয়ে সাগরে যেতে পারে, তার জন্য উপকূলীয় এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দস্যুদের গডফাদার বা যারা লোকালয় থেকে তথ্য সরবরাহ করে তাদের চিহ্নিত করার কাজও শুরু হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত এই পদক্ষেপের ফলে দ্রুতই সুন্দরবনে শান্তির পরিবেশ ফিরে আসবে।
নতুন সরকারের এই কঠোর অবস্থানে সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদে স্বস্তি ফিরবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বন বিভাগ ও বিভিন্ন বাহিনীর এই ‘কম্বাইন্ড অ্যাকশন’ দস্যুদের নির্মূলে কতটুকু কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।