বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত মাদক সম্রাট এবং ‘জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল’ (CJNG)-এর প্রধান নেমেসিও ওসেউয়েরা সেরভান্তেস, যিনি ‘এল মেনচো’ (El Mencho) নামেই সমধিক পরিচিত, মেক্সিকান বাহিনীর এক ঝটিকা অভিযানে নিহত হয়েছেন। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই মেক্সিকোর একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চরম উত্তেজনা ও ভয়াবহ সংঘাত। মাদক কার্টেল সদস্যদের প্রতিশোধমূলক তাণ্ডবে দেশটিতে এখন রণক্ষেত্র সদৃশ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
যৌথ অভিযান ও এল মেনচোর পতন মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ভোরে জালিস্কো অঙ্গরাজ্যে এক অত্যন্ত গোপনীয় ও সুপরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মেক্সিকান বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে এল মেনচো গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু ঘটে। এই হাই-প্রোফাইল মিশনে মেক্সিকান বাহিনীকে সরাসরি গোয়েন্দা সহায়তা (Intelligence Support) প্রদান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষ ‘টাস্কফোর্স’ (Task Force) এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন এল মেনচো ছিলেন গ্লোবাল টার্গেট? যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এল মেনচো ছিলেন দীর্ঘদিনের মাথাব্যথার কারণ। মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে সিনথেটিক ওপিওইড ‘ফেন্টানিল’ (Fentanyl) উৎপাদন ও পাচারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে মাদকের মহামারি সৃষ্টির পেছনে তার কার্টেলকে প্রধান অভিযুক্ত ধরা হয়। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রশাসন ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিশাল ‘বাউন্টি’ (Bounty) বা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। মেক্সিকোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম মাদকের এই রুট বন্ধ করতে ওয়াশিংটনের দিক থেকে নজিরবিহীন চাপের মুখে ছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে এই বড় ধরনের সামরিক সাফল্য এলো।
প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে মেক্সিকো নেতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই মেক্সিকোর অন্তত আটটি রাজ্যে তাণ্ডব শুরু করেছে সিজেএনজি (CJNG) কার্টেলের সদস্যরা। ক্ষুব্ধ সমর্থকরা বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় গাড়িতে আগুন দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করেছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালাচ্ছে। বিশেষ করে জালিস্কো, মিচোয়াকান এবং গুয়েরেরো রাজ্যে অরাজকতা চরম আকার ধারণ করেছে। সাধারণ নাগরিকদের ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক সতর্কতা ও বিমান চলাচল স্থগিত মেক্সিকোর এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর (State Department) এক বিশেষ বার্তায় মেক্সিকোর সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের ‘সেফ শেল্টার’ বা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় অ্যারোমেক্সিকো, এয়ার কানাডা, ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ও আমেরিকান এয়ারলাইন্স ওই অঞ্চলে তাদের ফ্লাইট অপারেশন (Flight Operations) সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এল মেনচোর মৃত্যু মেক্সিকোর মাদক সাম্রাজ্যে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার লড়াই বা ‘কার্টেল ওয়ার’ (Cartel War)-কে আরও উসকে দিতে পারে। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মেক্সিকো সরকার দেশজুড়ে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে।