আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতুর দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাবে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রুপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও। বিশ্ববাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারেও পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
ডলারের দরপতন ও ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বিশ্ববাজারে স্বর্ণের এই দাম বাড়ার নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি যুগান্তকারী রায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিশেষ শুল্ক (Tariff) আরোপের সিদ্ধান্ত আদালত বাতিল করে দেওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মান কমতে শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীরা ডলারের চেয়ে স্বর্ণকে 'সেফ হ্যাভেন' (Safe Haven) বা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বেছে নিতে শুরু করায় চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। এর ফলে সোমবার স্পট মার্কেটে (Spot Market) স্বর্ণের দাম ১.২ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৫ হাজার ১৬৩.৬০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ফিউচার মার্কেটে মার্কিন স্বর্ণের দাম ২ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ১৮৪.৯০ ডলারে পৌঁছেছে।
রেকর্ড ছুঁল রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও বড় ধরনের তেজি ভাব দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট রুপার দাম ৩.১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৮৭.১০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া প্লাটিনামের দাম ১.২ শতাংশ এবং প্যালাডিয়ামের দাম ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চীনের চন্দ্র নববর্ষের ছুটির কারণে মূল ভূখণ্ডের বাজার বন্ধ থাকায় লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কম হলেও মূল্যের অস্থিরতা (Volatility) অনেক বেশি। মঙ্গলবার চীনের বাজার পুনরায় খুললে দামের এই গ্রাফ আরও উঁচুতে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিনিয়োগকারীদের মানসিকতা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়া এবং ডলারের মান নিম্নমুখী হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে, সিএমই’র ফেডওয়াচ টুল (FedWatch Tool) অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন যে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ (Federal Reserve) চলতি বছরে অন্তত তিনবার সুদের হার কমাতে পারে। সাধারণত সুদের হার কমানোর পূর্বাভাস থাকলে স্বর্ণের চাহিদা ও দাম—উভয়ই বৃদ্ধি পায়। ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নমনীয় হওয়ার সংকেতও বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দেশের বাজারে অশনি সংকেত বিশ্ববাজারে এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের বাজারেও স্বর্ণ ও রুপার দাম পুনরায় সমন্বয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাজুস। সংগঠনটির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম বিশ্ববাজারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, তাই যে কোনো সময় নতুন মূল্য তালিকা ঘোষণা করা হতে পারে।
উল্লেখ্য, সবশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারি দেশে স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট ২ লাখ ৪৭ হাজার ১০২ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট ২ লাখ ১১ হাজার ৭৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রুপার ক্ষেত্রে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি এখন ৬ হাজার ৭০৭ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমান যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম খুব শীঘ্রই আড়াই লাখের কোটা ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।