বিশ্ববাণিজ্যের মোড়ল হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নাটকীয় পরিবর্তনের ঢেউ এবার আছড়ে পড়ল বাংলাদেশের উপকূলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত অতিরিক্ত শুল্কনীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করার পর ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রবল ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তবে এই আইনি ধাক্কাকে নেতিবাচকভাবে না দেখে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে দরকষাকষির এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও শিল্পোদ্যোক্তারা।
সুপ্রিম কোর্টের রায় ও ট্রাম্পের পাল্টা হুঙ্কার
গত বছরের এপ্রিলে বিশ্বজুড়ে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে এবং দেশীয় শিল্প রক্ষায় বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বা ‘Tariff’ আরোপের ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়া এই নীতিটি বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছিল। তবে গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে এই শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে তা বাতিল করে দেয়।
আদালতের এই রায়ে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘Section 332’ এবং বিদ্যমান ‘Section 301’-এর আওতায় শুল্ক বহাল থাকবে। এর পাশাপাশি ‘Section 122’-এর অধীনে স্বাভাবিক শুল্কের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ‘Global Tariff’ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এমনকি তথাকথিত অন্যায্য বাণিজ্য কার্যক্রম মোকাবিলায় ‘Section 301’-এর অধীনে নতুন তদন্ত শুরু করার হুমকিও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তি ও নতুন সমীকরণ
গত ৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের আরোপিত বাড়তি শুল্কের চাপ থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি করে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে সই করে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এখন মার্কিন আদালতের রায়ে সেই অতিরিক্ত শুল্কই যদি অবৈধ হয়ে যায়, তবে ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তির উপযোগিতা কতটুকু—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন ওই চুক্তির শর্তগুলো জাতীয় স্বার্থে ‘Renegotiation’ বা পুনর্বিবেচনার একটি শক্ত আইনি ভিত্তি পেয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমান এই পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তার মতে, "বাংলাদেশকে এখন চুক্তির ধারাগুলো আলোচনার মাধ্যমে পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করতে হবে। কারণ চুক্তিতে শুধু ‘Reciprocal Tariff’ নয়, আরও কিছু কঠিন শর্ত বা ‘Clauses’ রয়েছে যা বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এগুলো কমানোর একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে।"
ব্যবসায়ী মহলে অসন্তোষ ও পুনর্বিবেচনার দাবি
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা এই চুক্তি নিয়ে শুরু থেকেই কিছুটা সন্দিহান ছিলেন। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ সরাসরি একে ‘একপেশে’ চুক্তি বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সুবিধা নেই। তাই বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সরকারকে মার্কিন প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
একই সুরে কথা বলেছেন বিকেএমইএর (BKMEA) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, "মার্কিন আদালত আগের শুল্ক বাতিল করেছে এবং বাংলাদেশেও নতুন সরকার দায়িত্বে রয়েছে। এই দুই পরিবর্তনই আমাদের নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ করে দেয়। আমি প্রধানমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রতি আবেদন জানাই, এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দেশের রফতানি খাতের স্বার্থ রক্ষা করুন।"
সরকারের অবস্থান ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আপাতত ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করছে। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান মনে করেন, ট্রাম্পের ‘Reciprocal Tariff’-এর ধারণা কার্যকর থাক বা না থাক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি বেশ মজবুত। তিনি জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় এমন কিছু করা হবে না।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় আপিলে টিকবে কি না বা ট্রাম্প প্রশাসন ভবিষ্যতে নতুন কোনো ‘Trade War’ শুরু করবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে বাংলাদেশের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে—তড়িঘড়ি করে কোনো শর্ত বাস্তবায়ন না করে বিশ্ব বাণিজ্যের এই টালমাটাল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ‘Strategic Shift’ আনা।