বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে ঘিরে দিল্লির রাজপথে এবং বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। পর্তুগালের ‘Visa’ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভারতের রাজধানীতে পা রাখা এই ছাত্রনেতাকে ঘিরে এবার উঠে এসেছে ‘Cryptocurrency’ সংক্রান্ত এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবি, মাহদী হাসানের কাছে বিপুল অংকের ডিজিটাল মুদ্রা থাকার তথ্যই ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও গোয়েন্দা নজরদারি
গত মঙ্গলবার দিল্লির কনট প্লেসের একটি ভিসা প্রসেসিং সেন্টারে মাহদী হাসান যখন তার আবেদন জমা দিতে যান, তখনই তাকে কেউ শনাক্ত করে ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিও ‘Social Media’-তে ভাইরাল হওয়ার মুহূর্তেই তা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে আসে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাহদী হাসান তার ভবিষ্যৎ ইউরোপ যাত্রার খরচ মেটাতে সঙ্গে করে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি এনেছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি সূত্রের দাবি, এই মুদ্রার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় অন্তত ৪০ লক্ষাধিক। যদিও এই অর্থের সুনির্দিষ্ট উৎস বা পরিমাণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে, তবে ডিজিটাল কারেন্সি ব্যবহারের এই কৌশলটি ভারতীয় গোয়েন্দাদের বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
কেন ভারতীয় গোয়েন্দাদের নিশানায় মাহদী?
মাহদী হাসানকে ঘিরে ভারতীয় ‘Security Agencies’-এর তৎপরতার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ ছিল অত্যন্ত জোরালো। গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে: ১. ভারতবিরোধী বক্তব্য: অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বিরুদ্ধে তার কঠোর ও উস্কানিমূলক বক্তব্য। ২. পুলিশ হত্যার দাবি: বাংলাদেশের একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করার প্রকাশ্যে দাবি তোলা, যা তাকে ‘Sovereign Security’-র জন্য একজন সন্দেহভাজন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। ৩. ধর্মীয় বিদ্বেষ: জনৈক হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার বিষয়ে তার সাম্প্রদায়িক মন্তব্য।
নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, "একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি, যিনি প্রকাশ্য জনসভায় পুলিশ হত্যার দাবি করেন এবং ভারতবিরোধী মন্তব্য করেন, তিনি দিল্লির বুক চিরে অন্য দেশে পাড়ি দেবেন আর আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব, তা সম্ভব নয়।"
পাহাড়গঞ্জ থেকে বিমানবন্দর: নাটকীয় ২৪ ঘণ্টা
মঙ্গলবার সকাল ১১টার পর থেকেই মাহদী হাসানের কাছে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অজানা নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করে। পরিস্থিতির গুরত্ব বুঝতে পেরে তিনি পাহাড়গঞ্জের হোটেল ত্যাগ করেন এবং ধরা পড়ার ভয়ে বিমানবন্দরের নিকটস্থ একটি হোটেলে গা ঢাকা দেন। সেই রাতেই তার জন্য দিল্লি-ঢাকা ‘IndiGo’ ফ্লাইটের টিকিট নিশ্চিত করা হয়।
বুধবার সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় তাকে নিরাপত্তা তল্লাশি লাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় আধঘণ্টা ধরে তাকে কড়া জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়। তবে সূত্রের দাবি, তাকে কোনো ধরনের ‘Physical Assault’ বা শারীরিক নিগ্রহ করা হয়নি, কেবল তার সফর এবং কার্যক্রম নিয়ে জেরা করা হয়েছে।
মাহদী হাসানের বক্তব্য: হ্যারাসমেন্ট নাকি গুজব?
ঢাকায় ফিরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মাহদী হাসান সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, "আমাকে বৈষম্যবিরোধী নেতা হিসেবে আটক করে প্রচণ্ড ‘Harassment’ করা হয়েছে। আমি জীবন ঝুঁকিতে ছিলাম।"
তবে ক্রিপ্টোকারেন্সি বহনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা সরাসরি নাকচ করে দেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি সংক্ষেপে বলেন, "এটি স্রেফ গুজব।"
দিল্লির ব্যস্ত রাজপথে শনাক্ত হওয়া থেকে শুরু করে গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিমানবন্দরে জেরা—সব মিলিয়ে মাহদী হাসানের এই সফর ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যের জাল এখনো কাটেনি। এই ঘটনায় ‘Digital Currency’ এবং নিরাপত্তা ইস্যুগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।