ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে বর্তমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এক সময় নামিবিয়া কিংবা উগান্ডার মতো দলের কাছে হেরে মূল পর্বের টিকিট না পাওয়া জিম্বাবুয়ে আজ বিশ্বমঞ্চে দানবীয় রূপে আবির্ভূত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার মতো দুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও ক্রিকেট পরাশক্তিকে (Powerhouse) টপকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে সুপার এইটে (Super Eight) জায়গা করে নিয়েছে তারা। আর এই অসাধ্য সাধনের নেপথ্যে আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করছেন তাদের অধিনায়ক সিকান্দার রাজা। তবে তার এই লড়াই কেবল ব্যাটে-বলে নয়, ছিল আধ্যাত্মিকও।
সেহরি সেরে লঙ্কান বধে রাজার তান্ডব
গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে লঙ্কানদের বিপক্ষে জয়টি ছিল জিম্বাবুয়ের জন্য এক বড় বিবৃতি। স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার দেওয়া ১৭৮ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ব্রায়ান বেনেটের ৪৮ বলে ৬৩ এবং অধিনায়ক সিকান্দার রাজার ২৬ বলে ৪৫ রানের ক্যামিও ইনিংসে ৩ বল বাকি থাকতেই জয় নিশ্চিত করে জিম্বাবুয়ে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই বিধ্বংসী ইনিংস খেলার সময় সিকান্দার রাজা রোজা পালন করছিলেন।
ক্রিকইনফোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজা তার রমজানের রুটিন শেয়ার করে বলেন, "ম্যাচের আগের দিন (২০ ফেব্রুয়ারি) আমি সেহরি পর্যন্ত জেগে ছিলাম। যদি রাত এক-দুইটায় ঘুমাতাম, তবে ভোর সাড়ে চারটায় ওঠা আমার জন্য কঠিন হতো। তাই সারা রাত জেগে থেকে সেহরিতে শুধু দুধ, খেজুর, মধু আর অল্প কিছু ফল খেয়েছি।"
মাঠে ক্লান্তি ভর করে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রাজার দার্শনিক উত্তর, "অনেকেই ভাবেন রোজা রাখলে হয়তো দুর্বল লাগে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, রোজা আমার ভেতরের আত্মিক শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। এটি শক্তি কেড়ে নেয় না, বরং আমাকে দ্বিগুণ উদ্যমে লড়াই করার শক্তি দেয়।"
‘অ্যাসোসিয়েট’ তকমা ও ধারাভাষ্যকারদের কড়া জবাব
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়ার মতো ফেবারিট দলকে বিদায় করে জিম্বাবুয়ের সুপার এইটে ওঠা দেখে অনেক ধারাভাষ্যকার ও ক্রিকেট বিশ্লেষক বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তাদের কেউ কেউ জিম্বাবুয়েকে ‘অ্যাসোসিয়েট’ (Associate) দেশগুলোর সাফল্যের তালিকায় ফেলেছেন। এতে বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজা।
তিনি বলেন, "অনেকেই নিজেদের হোমওয়ার্ক ঠিকমতো করেন না। জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান এবং আয়ারল্যান্ড যে আইসিসির পূর্ণ সদস্য (Full Member) এবং টেস্ট খেলুড়ে দেশ, সেটা ভুলে গিয়ে তারা যা খুশি বলে দেন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন। মাঠে যখন খেলা হয়, তখন লড়াইটা হয় এগারো জন বনাম এগারো জনের। সেখানে ঐতিহ্যের চেয়ে বড় হলো ওই দিন আপনি কেমন খেলছেন।"
ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা: ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান
জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে গত কয়েক বছর ছিল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। ২০২৩ সালের রিজিওনাল কোয়ালিফায়ারে নামিবিয়া ও উগান্ডার কাছে হেরে ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়া ছিল দেশটির ক্রিকেটের ইতিহাসে গভীরতম ক্ষত। রাজা অকপটে স্বীকার করেন, সেই দুর্দশার জন্য খেলোয়াড়রাই দায়ী ছিলেন।
তিনি বলেন, "আমরাই জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটকে এই নিচু স্তরে নামিয়েছিলাম। তাই আমাদেরই দায়িত্ব ছিল একে টেনে তোলা। ২০২২ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের কাছে হার বা বাংলাদেশের বিপক্ষে মাত্র ৩ রানের পরাজয় আমাদের বড় ধাক্কা দিয়েছিল। সেই ধাক্কাটা আমাদের দরকার ছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, নিজেদের দায় এড়িয়ে পালানোর পথ নেই।"
প্রস্তুতির ঘাটতি ও অদম্য ইচ্ছা
অন্যান্য বড় দলগুলো যখন একের পর এক আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলে বিশ্বকাপে এসেছিল, জিম্বাবুয়ে তখন ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগ খেলে সরাসরি লঙ্কান কন্ডিশনে চলে আসে। প্রস্তুতির বিষয়ে রাজা বলেন, "হয়তো আমরা অন্য দলগুলোর মতো শতভাগ প্রস্তুত ছিলাম না, কিন্তু আমাদের মানসিক জেদ ছিল তুঙ্গে। হাম্বানটোটায় দশ দিনের প্রস্তুতি আমাদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।"
সিকান্দার রাজার নেতৃত্বে জিম্বাবুয়ের এই পুনর্জাগরণ কেবল একটি দলের সাফল্য নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে দৃঢ় মনোবল এবং দেশপ্রেম থাকলে যেকোনো ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিরে আসা সম্ভব। সুপার এইটে এখন বড় দলগুলোর জন্য জিম্বাবুয়ে এক বড় আতঙ্কের নাম।