জাপানের রাজধানী টোকিওর খুব কাছেই অবস্থিত ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানা। সেখানে বসবাসরত ৭ মাস বয়সি এক খুদে সদস্য এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ‘ইন্টারনেট স্টার’ (Internet Star)। নাম তার ‘পাঞ্চ’। বাদামী রঙের ছোটখাটো এই ম্যাকাক (Macaque) শাবকটির জীবনকাহিনি কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। জন্মের পর মায়ের সান্নিধ্য না পাওয়া এবং দীর্ঘদিনের চরম একাকীত্ব কাটিয়ে পাঞ্চের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘টক অব দ্য টাউন’।
মায়ের শূন্যতা আর খেলনা পুতুলের বন্ধুত্ব
পাঞ্চের জন্ম গত বছরের জুলাই মাসে। প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে জন্ম নেওয়ার পর এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে খুদে এই শাবকটি। কোনো এক অজানা কারণে জন্মদাত্রী মা তাকে ত্যাগ করে চলে যায়। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, জাপানি ম্যাকাক প্রজাতির বানরদের মধ্যে বিশেষ করে যারা প্রথমবার মা হয়, তাদের ক্ষেত্রে শাবক ত্যাগ করার ঘটনা বিরল নয়।
মায়ের অনুপস্থিতিতে পাঞ্চের আশ্রয় হয় চিড়িয়াখানার কর্মীদের স্নেহে। তবে একাকীত্ব যেন তার পিছু ছাড়ছিল না। তাকে অন্যান্য বানরদের ঘেরাটোপে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিল না। বড় বানরদের ভয়ে সে গুটিয়ে থাকত। এই সময় তার সঙ্গী হিসেবে দেওয়া হয় একটি ওরাংওটাং আকৃতির খেলনা পুতুল। পাঞ্চ সেই খেলনাটিকেই আঁকড়ে ধরে বড় হতে থাকে। তার পেশি শক্তিশালী (Muscle Strengthening) করতে এবং মানসিক প্রশান্তি জোগাতে এই খেলনাটি ছিল তার একমাত্র অবলম্বন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ‘পাঞ্চ’ হ্যাসট্যাগ
পাঞ্চের একাকীত্বের গল্প ও তার করুণ ভিডিওগুলো যখন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেটে শেয়ার করে, তখন থেকেই শুরু হয় এক অভাবনীয় উন্মাদনা। বিশেষ করে #HangInTherePunch (পাঞ্চ, হাল ছেড়ো না) হ্যাসট্যাগটি (Hashtag) সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে মানুষের সহমর্মিতা পায় এই ছোট্ট বানরটি। সাম্প্রতিক অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মাঝে নেটিজেনরা পাঞ্চের জীবনসংগ্রামের মধ্যে এক টুকরো আনন্দ খুঁজে পান। অনেক ভক্ত তো এমনও মন্তব্য করেছেন যে, তারা পাঞ্চকে দত্তক নিয়ে নিজেদের সন্তানের মতো বড় করতে চান।
একাকীত্ব ঘুচিয়ে নতুন জীবনের পথে: সোশ্যাল ইন্টিগ্রেশন
সম্প্রতি ইচিকাওয়া চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের শেয়ার করা নতুন ভিডিওতে দেখা গেছে এক আশাব্যঞ্জক দৃশ্য। যে পাঞ্চ আগে একা কোণঠাসা হয়ে বসে থাকত, সে এখন ধীরে ধীরে ‘সোশ্যাল ইন্টিগ্রেশন’ বা সামাজিকীকরণের পথে এগোচ্ছে। তাকে এখন অন্য বানরদের পিঠে চড়তে, বড়দের সঙ্গে বসে রোদ পোহাতে এবং এমনকি আলিঙ্গন করতেও দেখা যাচ্ছে।
ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানা ও উদ্ভিদ উদ্যান বিভাগের প্রধান তাকাশি ইয়াসুনাগা জানান, "প্রথমদিকে পাঞ্চ কিছুটা ভীত থাকলেও এখন তার মধ্যে একটি সক্রিয় ও নির্ভীক ব্যক্তিত্ব (Active and Fearless Personality) গড়ে উঠেছে। সে এখন নিজ থেকেই অন্য বানরদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।"
পর্যটকদের ঢল ও ‘পাঞ্চ’ উন্মাদনা
পাঞ্চের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা কেবল ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ নেই। গত সপ্তাহে প্রায় আট হাজার মানুষ এই ছোট্ট বানরটিকে একপলক দেখতে ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানায় ভিড় করেছেন। এই সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। চিড়িয়াখানার গণ্ডি ছাড়িয়ে পাঞ্চ এখন এক আন্তর্জাতিক সিম্বল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা আমাদের শেখায়—সহমর্মিতা আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিই জয় করা সম্ভব।