বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়ার সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বিশেষ করে রাশিয়ার 'নিউক্লিয়ার ট্রায়াড' (পারমাণবিক অস্ত্র বহনের ত্রিমুখী মাধ্যম—ভূমি, আকাশ ও সমুদ্র) উন্নয়নকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘নিঃশর্ত অগ্রাধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন তিনি। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাশিয়ার ঐতিহাসিক ‘ডিফেন্ডার অব দ্য ফাদারল্যান্ড ডে’ উপলক্ষে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরেন।
নিউক্লিয়ার ট্রায়াড: রাশিয়ার কৌশলগত প্রতিরক্ষা বর্ম
প্রেসিডেন্ট পুতিন তার ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power) বজায় রাখতে পারমাণবিক সক্ষমতার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “নিউক্লিয়ার ট্রায়াডের ধারাবাহিক উন্নয়ন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টি। এটি কেবল রাশিয়ার সুরক্ষা নিশ্চিত করে না, বরং বৈশ্বিক স্তরে কৌশলগত প্রতিরোধ (Strategic Deterrence) বজায় রাখতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।”
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পুতিনের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন পশ্চিমা বিশ্বের সাথে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে। পারমাণবিক শক্তিতে আধুনিকায়নের এই প্রক্রিয়া রাশিয়ার সামরিক বাহিনীকে আরও বিধ্বংসী ও অপরাজেয় করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির সমন্বয়
কেবল পারমাণবিক শক্তিই নয়, প্রথাগত সামরিক শক্তিতেও (Conventional Forces) আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন পুতিন। তিনি জানান, ইউক্রেন সংঘাত থেকে অর্জিত বাস্তব যুদ্ধ অভিজ্ঞতাকে (Combat Experience) ভিত্তি করে রাশিয়ার সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীকে আরও আধুনিকায়ন করা হবে।
পুতিন তার বক্তব্যে রাশিয়ার বিজ্ঞান ও উচ্চপ্রযুক্তি (High-tech) খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “দেশের শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি শাখার যুদ্ধ প্রস্তুতি (Combat Readiness) বাড়ানো হবে।” এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আগামী দিনগুলোতে রুশ সামরিক বাহিনীতে AI (Artificial Intelligence) এবং ড্রোন প্রযুক্তির মতো আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার আরও ব্যাপক হবে।
পারমাণবিক চুক্তির অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সবশেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির (New START) মেয়াদ শেষ হতে এক মাসেরও কম সময় বাকি। এমন এক সন্ধিক্ষণে পুতিনের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যদিও মস্কো দাবি করেছে যে, তারা ‘উত্তেজনা বৃদ্ধির দিকে প্রথম পদক্ষেপ নেবে না’ এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ওয়ারহেড (Warhead)-এর সংখ্যা বাড়াবে না, তবে এর জন্য ওয়াশিংটনকেও একই নীতি অনুসরণ করতে হবে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই চুক্তিতে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতি। তবে বেইজিং শুরু থেকেই এই প্রস্তাবকে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। চীনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তুলনায় তাদের পারমাণবিক ভাণ্ডার অত্যন্ত ক্ষুদ্র। এই ত্রিপক্ষীয় টানাপোড়েনের ফলে বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে।
জাতীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্বের ডাক
পুতিন তার বক্তব্যে রাশিয়ার জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিয়োজিত সেনাদের বীরত্বের প্রশংসা করেন। তিনি মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে রাশিয়ার স্বনির্ভরতা ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বই দেশটিকে যেকোনো বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। রাশিয়ার এই সামরিক পুনর্গঠন কেবল একটি দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নয়, বরং এটি সমকালীন বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়ার প্রভাব টিকিয়ে রাখার এক বড় রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
পুতিনের এই হার্ডলাইন (Hardline) অবস্থান ভবিষ্যতে ন্যাটো (NATO) এবং রাশিয়ার মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।