দেশের বাজারে স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থামছেই না। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো বাড়ানো হয়েছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সবশেষ সমন্বয়ে প্রতি ভরি স্বর্ণে ২ হাজার ২১৬ টাকা বৃদ্ধি করেছে, যা আজ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে কার্যকর হয়েছে। ফলে দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের দাম এখন নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছাল।
নতুন দরের বিস্তারিত পরিসংখ্যান বাজুসের নির্ধারিত নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, দেশের বাজারে এখন থেকে সবচাইতে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকায়। এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি এই মানদণ্ডের স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮২৪ টাকা।
অন্যান্য মানের স্বর্ণের ক্ষেত্রেও দামের উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমানে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৩ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৩ হাজার ৫৬৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ এখন ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৮৫ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। মূলত স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (Pure Gold) দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বৈশ্বিক মার্কেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাজুস।
অতিরিক্ত খরচ: ভ্যাট ও মজুরির হিসাব ভোক্তাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাজুস নির্ধারিত এই দামটি শুধুমাত্র স্বর্ণের অলংকারের বেস প্রাইজ (Base Price)। জুয়েলারি দোকান থেকে গয়না কেনার সময় এই বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট (VAT) এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি (Making Charge) যুক্ত করা বাধ্যতামূলক। গয়নার নকশার জটিলতা ও মানভেদে এই মজুরির তারতম্য হতে পারে। ফলে ২২ ক্যারেটের এক ভরি গয়না কিনতে ক্রেতাকে এখন প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার টাকার কাছাকাছি গুনতে হতে পারে।
বাজারের অস্থিরতা ও ঘন ঘন সমন্বয় চলতি ২০২৬ সালের শুরু থেকেই স্বর্ণের বাজারে তীব্র অস্থিরতা বা Market Volatility লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বছরের প্রথম দুই মাসেই এখন পর্যন্ত ৩২ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ১২ বার কমানো হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০২৫ সালেও স্বর্ণের বাজার ছিল একইভাবে টালমাটাল। সেই বছর মোট ৯৩ বার দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস, যার মধ্যে ৬৪ বারই ছিল মূল্যবৃদ্ধির খবর। আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ বা 'Safe Haven Asset' হিসেবে বেছে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা, যা দেশের বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
রুপার বাজারে স্থিতাবস্থা স্বর্ণের দাম আকাশচুম্বী হলেও দেশের বাজারে বর্তমানে রুপার দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৭০৭ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৬ হাজার ৪১৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ৫ হাজার ৪৮২ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম ৪ হাজার ৮২ টাকা নির্ধারণ করা আছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১৮ বার রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১ বার দাম বেড়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের যোগান ও চাহিদার (Supply and Demand) ভারসাম্যহীনতার কারণে দেশের বাজারে দামের এই উথাল-পাথাল আরও কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে। সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এখন স্বর্ণ কেনা এক প্রকার বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।