চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার ১১২ কোটি টাকা। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নানামুখী চাপের মধ্যে রাজস্ব আহরণের এই নেতিবাচক চিত্র বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে আশার কথা হলো, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ১২.৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বা 'Growth Rate' বজায় রয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা বনাম অর্জন: খতিয়ান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে এনবিআর আদায় করতে সক্ষম হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সংগৃহীত হয়নি বিপুল পরিমাণ অর্থ। একক মাস হিসেবে শুধু জানুয়ারিতেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ হাজার ৫১২ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
খাতভিত্তিক বিপর্যয়ের চিত্র রাজস্ব আদায়ের তিনটি প্রধান উৎস—আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (VAT) এবং আয়কর—কোনো খাতেই লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি এনবিআর।
১. আয়কর খাতে বড় ধস (Direct Tax): সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে সরাসরি কর বা আয়কর খাতে। এই খাতে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ছিল, কিন্তু সংগৃহীত হয়েছে মাত্র ৭৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ কেবল আয়কর থেকেই ঘাটতি হয়েছে ২৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
২. আমদানি ও কাস্টমস ডিউটি (Customs Duty): বৈদেশিক বাণিজ্যে শ্লথগতি ও এলসি (LC) খোলার ক্ষেত্রে কড়াকড়ির প্রভাবে আমদানি পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ৭৮ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। এখানে ঘাটতির পরিমাণ ১৫ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা।
৩. ভ্যাট বা মূসক (Value Added Tax): অভ্যন্তরীণ ভোগ ও উৎপাদন খাতের অন্যতম উৎস ভ্যাট আহরণেও বড় বিচ্যুতি দেখা গেছে। ১ লাখ ১ হাজার ২৭৪ কোটি টাকার বিপরীতে ৮৫ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা কম।
প্রবৃদ্ধি যখন একমাত্র আশার আলো বিশাল অঙ্কের এই ‘Revenue Deficit’ বা ঘাটতির মাঝেও এনবিআরের কর্মকর্তারা প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯০ কোটি টাকা। সেই তুলনায় এবার আদায় বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে প্রায় ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা অর্থনীতির চাকা সচল থাকার ইঙ্গিত দেয়। তবে মুদ্রাস্ফীতি বা 'Inflation' এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কথা বিবেচনা করলে এই প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা।
কেন এই বিপুল ঘাটতি? অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রমের স্থবিরতা এবং কর প্রশাসনের সংস্কারে ধীরগতির কারণেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া আমদানি নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় 'Import Duty' কমেছে, যা রাজস্বের একটি বড় উৎস। ‘Fiscal Year’ এর বাকি পাঁচ মাসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআরকে এখন কর জাল সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে বা 'Digital Transformation' এ বিশেষ নজর দিতে হবে।
বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে এনবিআরকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের গতি আরও বাড়াতে হবে, অন্যথায় সরকারকে ব্যাংক ঋণ বা বিদেশি ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে হতে পারে।