মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ এখন আর কেবল অনুমানের স্তরে নেই। খোদ পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর (NATO) সাবেক সুপ্রিম অ্যালায়েড কমান্ডার জেমস জি স্ট্যাভরিডিস এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরতে গিয়ে চতুর্দশ শতকের প্রখ্যাত কবি দান্তে আলিগিয়েরির ‘ইনফার্নো’ বা নরকের রূপক ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, ইরানকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান সামরিক সজ্জা যেন এক জীবন্ত ‘দান্তের ইনফার্নো’, যার আগুনের লেলিহান শিখার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
দান্তের ইনফার্নো ও ৯টি বৃত্তের বিভীষিকা মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে (CNN) দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল স্ট্যাভরিডিস বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৯৯০-৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, “দান্তের ইনফার্নোর ৯টি বৃত্তের মতো যুক্তরাষ্ট্র একে একে সমকেন্দ্রিক বলয় তৈরি করে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।”
এই পরিকল্পনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি জানান, বাইরের বলয়গুলোতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘Strategic Bomber’ বা কৌশলগত বোমারু বিমান, যা মার্কিন মূল ভূখণ্ড বা নিকটস্থ সামরিক ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম। এর পরের স্তরে রয়েছে ‘Aircraft Carrier’ বা বিশাল বিমানবাহী রণতরী। বর্তমানে উত্তর ভারত মহাসাগরে একটি এবং সিরিয়া উপকূলে ইসরায়েলের পাশে একটি—মোট দুটি রণতরী মোতায়েন রয়েছে। এগুলোতে এফ-৩৫ (F-35) এবং এফ/এ-১৮ হর্নেটের (F/A-18 Hornet) মতো অত্যাধুনিক প্রায় ১৬০টি যুদ্ধবিমান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রণসজ্জার বহর: ‘টমাহক’ থেকে ‘সাইবার অ্যাটাক’ অ্যাডমিরাল স্ট্যাভরিডিসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই নরকসম পরিকল্পনার আরও গভীর স্তরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘Tomahawk Missile’, প্রাণঘাতী ড্রোন বহর এবং বিধ্বংসী ‘Cyber Capability’। তিনি সতর্ক করে বলেন, মার্কিন প্রশাসন কেবল আকাশপথে হামলা নয়, বরং সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পারমাণবিক স্থাপনা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এই পুরো সামরিক আয়োজনের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ‘Center of Gravity’ বা মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে। স্ট্যাভরিডিসের ভাষায়, “আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে একমত; খামেনির জন্য এখন আলোচনার টেবিলে আসাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।”
১০ দিনের আলটিমেটাম ও ট্রাম্পের রণকৌশল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক ঘোষণায় বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে কূটনীতি সফল হবে নাকি ওয়াশিংটন সামরিক পথে হাঁটবে—তা আগামী ১০ দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের দেওয়া তথ্যমতে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে এমন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই এই চরম সময়সীমা বা ‘Deadline’ নির্ধারণ করা হয়েছে।
যদি ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি থেকে সরে না আসে, তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ‘Revolutionary Guard’ (বিপ্লবী গার্ড), তাদের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং পারমাণবিক গবেষণাগারগুলোতে ‘Surgical Strike’ বা সীমিত পরিসরে হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে রেখেছে। সুইজারল্যান্ডে দুদেশের প্রতিনিধিদের সাম্প্রতিক বৈঠকে কোনো সমাধান না আসায় সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা এখন তুঙ্গে।
তেহরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ও আঞ্চলিক অস্থিরতা ওয়াশিংটনের এই রণহুঙ্কারকে ‘সরাসরি আগ্রাসনের হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছে তেহরান। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ইরানকে চাপের মুখে রাখা যাবে না। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো আঘাত এলে তার ‘সুনির্দিষ্ট ও দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যে পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে, তা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ট্রাম্পের এই ১০ দিনের সময়সীমা যদি কোনো ইতিবাচক কূটনৈতিক সমাধান ছাড়াই শেষ হয়, তবে দান্তের কবিতার সেই ৯টি বৃত্তের মতো ভয়াবহ এক যুদ্ধের দাবানল পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করতে পারে।