গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আবহে এবার সরাসরি ভূখণ্ডটি পুনর্দখলের হুঁশিয়ারি দিলেন ইসরাইলের কট্টরপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র সমর্পণ না করে, তবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) পুরো গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে বলে কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এক কড়া বিবৃতিতে তিনি জানান, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য খুব শীঘ্রই একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বা 'Deadline' ঘোষণা করা হতে পারে।
অস্ত্র সমর্পণের আলটিমেটাম ও যুদ্ধের নতুন সমীকরণ গত সপ্তাহে ইসরাইলি সরকারের পক্ষ থেকে হামাসকে ৬০ দিনের একটি আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরাইলের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইয়োসি ফুচস স্পষ্টভাবে জানান, হামাসকে তাদের কাছে থাকা একে-৪৭ রাইফেলসহ সব ধরনের সমরাস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। এই সময়সীমা নির্ধারণে মার্কিন প্রশাসনের বিশেষ অনুরোধ ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। ইসরাইলি প্রশাসনের দাবি, এই ৬০ দিনের মধ্যে হামাস যদি নিজেদের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ না করে, তবে গাজায় নতুন করে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান বা ‘Full-scale Military Operation’ শুরু করবে আইডিএফ।
হামাসের প্রত্যাখ্যান ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা ইসরাইলের এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে হামাস। সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতা মাহমুদ মারদাবি এক বিবৃতিতে জানান, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইসরাইলি মিডিয়ার মাধ্যমে দেওয়া এই হুঁশিয়ারিগুলো স্রেফ মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং হুমকির শামিল। চলমান আলোচনার টেবিলে এর কোনো আইনি বা বাস্তব ভিত্তি নেই বলে তিনি দাবি করেন। হামাসের এই অনমনীয় অবস্থানের পরই অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচ গাজা দখলের প্রচ্ছন্ন হুমকি নিয়ে হাজির হন।
স্মোট্রিচের রণকৌশল ও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী ইসরাইলি পাবলিক ব্রডকাস্টার ‘কান’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেজালেল স্মোট্রিচ বলেন, "আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গাজা পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণের (Demilitarization) আলটিমেটাম কার্যকর হতে পারে। হামাস যদি তা মেনে না নেয়, তবে ইসরাইলি সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক সমর্থন ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় নিজেরাই চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেবে।"
স্মোট্রিচ আরও জানান, নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থ হলে গাজায় সেনা পাঠিয়ে এলাকাটি পুরোপুরি দখল করার জন্য সরকারের কাছে দুই থেকে তিনটি ভিন্ন ‘Strategic Plan’ বা সামরিক পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কথিত শান্তি পরিকল্পনায় ২০ হাজার সদস্যের একটি ‘International Peacekeeping Force’ মোতায়েনের কথা থাকলেও স্মোট্রিচ এ ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান দেখিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, ইসরাইল যদি মনে করে অভিযান চালানো প্রয়োজন, তবে আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও আইডিএফ ব্যবস্থা নেবে এবং সেক্ষেত্রে বিদেশি সেনাদের সরে যেতে হবে। এই বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ‘Coordination’ চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
Ceasefire-এর আড়ালে অব্যাহত রক্তপাত ও মানবিক সংকট এদিকে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি বা ‘Ceasefire’ চললেও গাজার মাটিতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। গাজার দক্ষিণে নির্ধারিত যুদ্ধবিরতি রেখা বা ‘Yellow Line’ অতিক্রম করার অভিযোগে এক ফিলিস্তিনি যুবককে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া এবং দক্ষিণের খান ইউনিসে ট্যাংক ও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শুরুর পরও ইসরাইলি হামলায় নতুন করে অন্তত ৬১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
পশ্চিম তীরের নাবলুসেও উত্তেজনা ছড়িয়েছে, যেখানে একটি মসজিদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। এই পরিস্থিতিতে স্মোট্রিচের গাজা দখলের হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।