ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব এবার ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ রাজনীতিতে। রুশ তেল সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত ‘দ্রুজবা’ (Druzhba) পাইপলাইন বন্ধ রাখায় পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইউক্রেনে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে স্লোভাকিয়া। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দেশটির প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো এক বিবৃতিতে কিয়েভকে এই চরম আলটিমেটাম দেন। এর ফলে রাশিয়ার হামলার কারণে এমনিতেই বিধ্বস্ত ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং ‘Energy Security’ বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ল।
দ্রুজবা পাইপলাইন: শত্রুতা ও বন্ধুত্বের টানাপোড়েন রুশ শব্দ ‘দ্রুজবা’-এর বাংলা অর্থ হলো ‘মৈত্রী’ বা বন্ধুত্ব। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্যোগে নির্মিত এই পাইপলাইনটি রাশিয়া থেকে ইউক্রেন ও বেলারুশ হয়ে হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র ও জার্মানিতে সরাসরি অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) সরবরাহের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কয়েক দশক ধরে ইউরোপের এই দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান উৎস ছিল এই পাইপলাইন।
তবে গত ২৭ জানুয়ারি রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে এই পাইপলাইনের ইউক্রেন অংশটি বন্ধ করে দেয় জেলেনস্কি সরকার। কিয়েভের দাবি, রুশ বাহিনী পাইপলাইনের ওপর হামলা চালিয়ে তা অকেজো করে দিয়েছে, যা মেরামত করা বর্তমানে অসম্ভব। যদিও মস্কো এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে একে ইউক্রেনের একটি ‘Political Game’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
‘ব্ল্যাকমেইল’ বনাম ‘টিক-ফর-ট্যাট’ ডিপ্লোম্যাসি পাইপলাইন বন্ধের ফলে হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্রে রুশ তেলের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, যা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে। স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো এই পদক্ষেপকে ইউক্রেনীয় সরকারের ‘নিষ্ঠুর ব্ল্যাকমেইলিং’ বলে অভিহিত করেছেন।
সোমবারের ভাষণে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম মূলনীতি হলো পাল্টা পদক্ষেপ বা ‘Tit-for-Tat’ পলিসি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট যে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় আমরা সেদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছি। আমাদের এই পদক্ষেপ পুরোপুরি যথাযথ এবং যৌক্তিক।” তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন যে, পাইপলাইন দ্রুত সচল না হলে অদূর ভবিষ্যতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে ব্রাতিসলাভা।
বিদ্যুতের জন্য প্রতিবেশীদের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা ২০২২ সালে রুশ আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো রাশিয়ার নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় গত প্রায় দুই বছর ধরে স্লোভাকিয়ার কাছ থেকে বড় অংকের বিদ্যুৎ কিনে আসছিল কিয়েভ। প্রধানমন্ত্রী ফিকো জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই ইউক্রেন প্রায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ স্লোভাকিয়া থেকে আমদানি করেছে। এমন চরম নির্ভরতার সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত কিয়েভের জন্য বড় ধরনের ‘Logistical Disaster’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হাঙ্গেরির অর্থনৈতিক চাপ ও ইইউ-এর ঋণ জট স্লোভাকিয়ার পাশাপাশি ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে হাঙ্গেরিও। হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার শ্চিজার্তো গত ২১ ফেব্রুয়ারি এক বিস্ফোরক বিবৃতিতে জানান, ইউক্রেনের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) বরাদ্দকৃত ১০ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বিশাল অংকের ঋণ আটকে দিয়েছে হাঙ্গেরি। বুদাপেস্টের সাফ কথা—ইউক্রেন যত দ্রুত ‘দ্রুজবা’ পাইপলাইন মেরামত করে তেল প্রবাহ স্বাভাবিক করবে, তত দ্রুত এই ঋণের অর্থ ছাড়ের পথ সুগম হবে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের এই পর্যায়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর এমন হার্ডলাইন অবস্থান ইউক্রেনকে দ্বিমুখী সংকটে ফেলে দিয়েছে। একদিকে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধক্ষেত্র মোকাবিলা, অন্যদিকে জ্বালানি ও অর্থের জন্য প্রতিবেশীদের এই আলটিমেটাম—সব মিলিয়ে জেলেনস্কি প্রশাসনের জন্য আগামী দিনগুলো অত্যন্ত কঠিন হতে চলেছে।