মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিশ্ব কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন ওয়াশিংটন ডিসি। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ (State of the Union) ভাষণ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় এক ঘণ্টার এই দীর্ঘ ও তেজস্বী ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আমেরিকা তার হারানো মর্যাদা ও গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের জাতি আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে, যা আগের চেয়েও বড়, উন্নত, সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী।”
অর্থনৈতিক রূপান্তরের জয়গান ও ফিউচার এজেন্ডা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ভাষণে হোয়াইট হাউসে (White House) দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরের অর্জনগুলোকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, গত এক বছরে মার্কিন অর্থনীতিতে যে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে, তা কয়েক দশকের মধ্যে বিরল। তার প্রস্তাবিত ‘ইকোনমিক এজেন্ডা’ (Economic Agenda) বাস্তবায়নের ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও শিল্পায়নে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসী সুর এমন এক সময়ে এলো যখন বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ‘গ্লোবাল ট্যারিফ’ (Global Tariffs) বা বিশ্বব্যাপী শুল্ক নীতির কারণে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) এক ঐতিহাসিক রায়ে ট্রাম্পের কিছু শুল্ক নীতি বাতিল করা হয়েছে, যা প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক কৌশলের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের রণকৌশল: অভিবাসন ও অপরাধ দমন
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মিডটার্ম ইলেকশন’ (Midterm Election) বা মধ্যবর্তী নির্বাচন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণটি ছিল মূলত নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের এক ধরনের রাজনৈতিক প্রচারণা। ভাষণে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ইমিগ্রেশন পলিসি’ (Immigration Policy) বা অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সাথে দেশজুড়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্ত সুরক্ষায় তার সরকারের সাফল্য বর্ণনা করে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন তিনি।
ভূ-রাজনীতি ও সামরিক শক্তির প্রদর্শন
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ভাষণ ছিল বরাবরের মতোই আক্রমণাত্মক। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কোনো আপস করবে না। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব বজায় রাখা এবং কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন। এছাড়াও ভাষণে গ্রিনল্যান্ডে ভাসমান হাসপাতাল পাঠানোর মতো তার আলোচিত ও বিতর্কিত কিছু পরিকল্পনার যৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই ভাষণকে কেন্দ্র করে মার্কিন রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তার সমর্থকরা একে ‘আমেরিকার পুনর্জাগরণ’ হিসেবে দেখলেও বিরোধীরা একে দেখছেন স্রেফ রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর হিসেবে। তবে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে ট্রাম্প তার ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আগামী দিনগুলোতে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।