নীলফামারীর সৈয়দপুরে ক্ষুদ্র গার্মেন্টস কারখানা ও কারচুপি তৈরীর কার্যক্রম পুঁজি সংকটে স্থবির হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে উপজেলা শহরের প্রায় ছোট বড় ২৫০ কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১৭ সালে সচল কারখানার সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০০ এর মতো। সৈয়দপুর রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস মালিক সমিতির সভাপতি আকতার হোসেন খান জানান,শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার খান অ্যান্ড সন্স পোশাক কারখানায় কাজ করতেন প্রায় অর্ধশত শ্রমিক। ঢাকায় বড় বড় পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ায় ঝুঁট কাপড়ের দাম বৃদ্ধি এবং ভারতে স্থলপথে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞায় ক্রয় বিক্রয় সংকটে পড়েছে কারখানার উৎপাদন। এসব পোশাকের চাহিদা বাংলাদেশে যতটা, তার চেয়ে বেশি ভারত, নেপাল ও ভুটানে। এখানে পোশাক শিল্প কারখানার সাথে জড়িত কয়েক হাজার পরিবার। এছাড়াও, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, আর্থিক সংকটে কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেন তিনি। এখানে ৫০টি পরিবার বেকার হয়ে পড়েছেন। তাদের সংসার চালানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সুত্র জানায়, শুধু এই কারখানা নয় গত দুই বছরে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে এখনকার ছোট-বড় ২৫০ পোশাক কারখানা পুঁজি সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে ৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। এছাড়া সুতা, বকরম ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সৈয়দপুরে প্রায় দেড়শ কারচুপি শিল্পকারখানা বন্ধ। এতে করে বেকার হয়ে পড়েছে প্রায় ৫ হাজার নারী শ্রমিক। ফলে ১০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। সৈয়দপুর এক্সপোর্টেবল স্মল গার্মেন্টস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (ইএসজিওএ) জানিয়েছে, ঝুট কাপড়ের ব্যবসা শুরু হয়েছিল বিট্রিশ আমলে। ২০০২ সাল থেকে এর বিস্তার লাভ করে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে ঝুঁট কাপড় কেজি দরে ক্রয় করে, ট্রাউজার, শর্টস, জ্যাকেট, টি-শার্ট, জিন্সসহ বিভিন্ন পোশাক বিদেশের বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। ইএসজিওএ আরও জানায় ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ১৭ মে এক আদেশে বলেন, তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এখন থেকে কলকাতা সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি করা যাবে। আগে সৈয়দপুর থেকে বেনাপোল, সোনামসজিদ ও সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে পোশাক রপ্তানি করা হতো। আগে ভারতে পোশাক রপ্তানিতে খরচ হতো ২০ হাজার, এখন কলকাতা সমুদ্র বন্দর দিয়ে তা খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। ফলে অনেক ব্যবসায়ী এখন ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদন চালাচ্ছেন, শুধু বাজারে টিকে থাকার জন্য। তবে ব্যবসায়িদের অভিযোগ, সৈয়দপুর থেকে প্রায় দুই লাখ ডলারের পোশাক ভারতে রপ্তানি হয়েছিল। যা গত দুই বছরে কমেছে ৫০ শতাংশ। স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পোশাক রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা ও কাঁচামাল সংকটের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতাও অনেকটা দায়ী করছেন তারা। শহরের রসুলপুর এলাকার নারী শ্রমিক রোজিনা বেগম জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরি। তবে যে কারখানায় কাজ করতাম, সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। ‘লোকসানের জন্য মালিক কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। কিভাবে সংসার চলবে আল্লাহই জানে। রোজিনার মতো কাজ হারিয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে মাজেদা বেগমও। কারচুপি কারখানার মালিক মনতাজ হোসেন বলেন, ‘গোলাহাট ও উত্তরা আবাসন এলাকায় আমার তিনটি কারখানা ছিল। প্রতিটি কারখানায় ২৫-৩০ জন কারিগর কাজ করতেন। এতে বিনিয়োগ করে পুঁজি তুলতে না পারায় তিনটির মধ্যে দুটি কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি।’ এ শিল্প রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান মনতাজ। তিনি বলেন,স্কুল-কলেজের ছাত্রীরাও পড়াশোনার ফাঁকে এ কাজ করে বাড়তি আয় করেন। এখানকার কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি পোশাক স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চলে যায় রাজধানীসহ দেশের বড় বড় বিপণিকেন্দ্রে। ইনভেন্ট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এর মালিক হুমায়ুন কবির জানান, ‘৩২ বছর ধরে আমরা ঝুট কাপড়ের পোশাক বছরে অন্তত ৫ কোটি টাকার ভারত, নেপাল ও ভুটানে রপ্তানি করতাম। কিন্তু ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন স্থলপথে কোনো পণ্য রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না। এখন কেবল কলকাতা সমুদ্রবন্দর দিয়ে রপ্তানি করা যাচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে প্রায় তিনগুণ, সময় ও ভোগান্তি বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের রপ্তানি অন্তত ৫০ শতাংশ কমে গেছে। নীলফামারী চেম্বার অব কর্মাচ এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির জেষ্ট্য যুগ্ন আহব্বায়ক সোয়েল পারভেজ জানান, ‘সৈয়দপুর বাণিজ্যিক শহর হিসেবে এখানকার অধিকাংশ মানুষ ব্যবসার সাথে জড়িত থাকায় কর্মসংস্থান হয়েছে হাজার হাজার মানুষের। অথচ ব্যবসা সম্প্রসারণে মালিকরা ব্যাংকের ঋণ পাচ্ছে না। তাদের আর্থিক সংকটই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মালিক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, এখানে ক্ষুদ্র গার্মেন্টস পল্লী স্থাপন করা হউক।’
পুঁজিসংকটে সৈয়দপুরে ২৫০ ঝুঁট কাপড়ের কারখানার মালিক
দেশজুড়ে
১ মিনিট পড়া
তৈয়ব আলী সরকার ,নীলফামারী।