আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার রণাঙ্গনে এক অভাবনীয় এবং বিতর্কিত মোড় সামনে এসেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর খবরে যখন গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত, তখনই বেরিয়ে এল এক বিস্ফোরক তথ্য। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, ইরানে এই জোরালো সামরিক অভিযানের পেছনে কেবল ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বড় ধরনের ভূমিকা ছিল সৌদি আরবেরও। বিশেষ করে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (MBS) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চারজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ (The Washington Post) এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত এক মাস ধরে সৌদি যুবরাজ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একাধিকবার ব্যক্তিগত স্তরে নিবিড় আলাপচারিতা হয়েছে। এসব গোপন ফোনালাপে বিন সালমান বারবার ইরানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে জোরালো সমর্থন ও যুক্তি দেখিয়েছেন। অথচ আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং প্রকাশ্যে রিয়াদ সবসময়ই কূটনৈতিক আলোচনার (Diplomacy) মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। এই দ্বিমুখী অবস্থান এখন বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রকাশ্যে কূটনীতি, নেপথ্যে ‘লবিং’ ও ভূ-রাজনীতি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ অত্যন্ত সুকৌশলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ‘Lobbying’ চালিয়েছেন যাতে ইরানকে সামরিকভাবে কোণঠাসা করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও শিয়া-সুন্নি ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের যে কৌশলগত লক্ষ্য (Geopolitical Goal), তারই চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হিসেবে এই গোপন তৎপরতা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খামেনির প্রস্থান রিয়াদের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক বিজয় এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের পথে বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান ও ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ বার্তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘Truth Social’-এ খামেনিকে ‘ইতিহাসের অন্যতম দুষ্টু ব্যক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা (Intelligence) ও অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার নিখুঁত নজরদারি খামেনি কোনোভাবেই এড়াতে পারেননি। ট্রাম্পের এই বার্তার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। যদিও তেহরান প্রাথমিকভাবে এই মৃত্যুর খবর নাকচ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়।
ট্রাম্পের মতে, “এটি কেবল ইরানের জনগণের জন্য ন্যায়বিচার নয়, বরং সারা বিশ্বের সেই মহান আমেরিকানদের জন্যও ন্যায়বিচার, যারা খামেনির সন্ত্রাসী দলের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন।”
আইআরজিসি-র ভবিষ্যৎ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি (IRGC) এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা চরম মনোবল সংকটে ভুগছেন। তাদের অনেকেই এখন মার্কিন প্রশাসনের কাছ থেকে নিরাপত্তা (Immunity) প্রার্থনা করছেন বলে ট্রাম্প তার পোস্টে ইঙ্গিত দিয়েছেন। সৌদি আরবের এই সম্ভাব্য ‘গোপন সমর্থন’ ইরান ও সৌদির মধ্যকার ভঙ্গুর কূটনৈতিক সম্পর্ককে আবারও এক চরম সংঘাতের মুখে ঠেলে দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। রিয়াদের এই ‘Strategic Move’ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনবে নাকি নতুন কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করবে, তা নিয়েই এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।