মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এখন এক আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করার পর এবার দেশটিতে চরম প্রতিশোধের ডাক দিয়েছে শক্তিশালী সামরিক শাখা ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (IRGC)। রোববার (১ মার্চ) সকালে এক কঠোর বার্তায় আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা ইরানের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বিধ্বংসী’ সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। এই ঘোষণায় পুরো অঞ্চলে এক ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
‘অপারেশন আল-কুদস’: চূড়ান্ত অভিযানের প্রস্তুতি ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজencies এবং কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে এই আসন্ন হামলাকে এক ঐতিহাসিক ও প্রলয়ংকরী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী সামরিক অভিযান (Military Operation) শুরু হতে যাচ্ছে। আর মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই এই অভিযান পরিচালিত হবে অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন সন্ত্রাসী ঘাঁটি (US Bases) এবং অধিকৃত ভূখণ্ড লক্ষ্য করে।”
শনিবার থেকেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে স্বল্প পাল্লার মিসাইল ছুড়তে শুরু করেছিল। তবে আইআরজিসি-র এই নতুন হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা এবার একটি বৃহৎ আকারের ‘Strategic Strike’ বা কৌশলগত বড় হামলার পরিকল্পনা করছে।
ধসে পড়া প্রাসাদের ভয়াবহ স্যাটেলাইট চিত্র ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম খামেনির বাসভবন ও কার্যালয়ের সর্বশেষ ‘Satellite Imagery’ বা কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি প্রকাশ করেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, তেহরানে অবস্থিত খামেনির প্রাসাদটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং চারপাশ পুড়ে কালো হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের ধরণ দেখে সামরিক বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নির্ভুল ‘Precision-Guided Munitions’ ব্যবহার করা হয়েছে।
ফার্স নিউজ জানিয়েছে, শনিবার ভোরে খামেনি যখন তার কার্যালয়ে ‘অর্পিত দায়িত্ব পালনরত’ ছিলেন, ঠিক তখনই এই ‘Targeted Strike’ চালানো হয়। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল নিশ্চিত করেছে যে, খামেনিকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করেই এই অভিযান পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
নেতৃত্বের শূন্যতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানে যে ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার শাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, খামেনি ছিলেন সেই ব্যবস্থার দ্বিতীয় কর্ণধার। ইরানের সামরিক বাহিনীর ‘Commander-in-Chief’ হিসেবে তিনি ছিলেন দেশটির সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের শেষ কথা। শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত এই নেতার মৃত্যুতে ইরানের ‘Command-and-Control’ ব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত এলেও আইআরজিসি দ্রুত সেই শূন্যতা কাটিয়ে প্রতিশোধের রণকৌশল সাজাচ্ছে।
অনিশ্চয়তায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা খামেনি নিধনের পর ইরানের অভ্যন্তরে যেমন ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে, তেমনি সীমানার বাইরে চরম উত্তজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের এই ‘বিধ্বংসী হামলার’ হুমকি কেবল একটি সামরিক ঘোষণা নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ‘Regional Security’ বা আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে দেওয়ার সংকেত। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইতিমধ্যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) এবং রণতরীগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় (High Alert) রেখেছে।
বিশ্বের কূটনীতিকরা এখন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা করছেন ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। তেহরানের এই ‘প্রতিশোধের আগুন’ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী কোনো যুদ্ধের দাবানল জ্বালায় কি না, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।