আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় হিসেবে পরিচিত ছিল দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন ও কার্যালয়। কিন্তু সেই ‘সুরক্ষিত’ এলাকাতেই হানা দিল মৃত্যু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক অভাবনীয় যৌথ অভিযানে (Joint Operation) প্রাণ হারিয়েছেন ইরানের শীর্ষ নেতা। রোববার (১ মার্চ) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি এবং আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম এই মর্মান্তিক সংবাদটি নিশ্চিত করেছে। বিশ্বজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন—কীভাবে সম্ভব হলো এই অভিযান?
বৈঠক চলাকালীন অভাবনীয় ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক’ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শনিবার ভোরের দিকে যখন হামলাটি চালানো হয়, তখন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তার অতি বিশ্বস্ত ও শীর্ষ উপদেষ্টাদের নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে জানানো হয়েছে, হামলার সময় খামেনি তার সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (SNSC) সচিব আলী লারিজানি এবং সাবেক সচিব আলী শামখানির সঙ্গে এক অতি গোপন ও সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে আলোচনা করছিলেন।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের ‘Targeted Operation’-এর জন্য ঠিক এই মুহূর্তটিকেই বেছে নেয়। ‘High-Precision’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ভবনটির সুরক্ষা বলয় ভেদ করা হয়। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, এটি কেবল একটি সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল না, বরং এটি ছিল এক নিখুঁত ‘Decapitation Strike’, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সমূলে উপড়ে ফেলা।
নিহতদের তালিকায় আরও যেসব শীর্ষ সামরিক ব্যক্তিত্ব অভিযানের ভয়াবহতা কেবল খামেনির মৃত্যুতেই সীমাবদ্ধ নেই। এই হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের ছায়া-সরকারের অন্যতম কারিগর ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাবেক সচিব আলী শামখানি। এ ছাড়া ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) গ্রাউন্ড ফোর্সের কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপোরের মৃত্যুর বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে সূত্রগুলো। এই শীর্ষ নেতাদের একসঙ্গে উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ইরান কোনো বড় ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ছিল, যা ‘Intelligence’ মারফত আগেই ফাঁস হয়ে যায়।
ধ্বংসস্তূপের ছবি: কী বলছে স্যাটেলাইট ইমেজ? হামলার কয়েক ঘণ্টা পর কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা খামেনির বাসভবনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া স্যাটেলাইট ইমেজ (Satellite Imagery) প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত প্রাসাদটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ভবনের চারপাশের বিশাল এলাকা কালো বর্ণ ধারণ করেছে, যা নির্দেশ করে সেখানে প্রচণ্ড শক্তিশালী কোনো বিস্ফোরণ (High-Intensity Explosion) ঘটানো হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্যাটেলাইট চিত্রে ধ্বংসের যে ধরণ দেখা যাচ্ছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে মাটির গভীর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম ‘Bunker-Buster’ বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনটির চারপাশের পোড়া দাগ এবং কংক্রিটের ধরণ দেখে স্পষ্ট যে, সুরক্ষিত ওই ভবনের কোনো বাসিন্দার পক্ষেই এই হামলা থেকে বেঁচে ফেরা সম্ভব ছিল না।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা নাকি আধুনিক প্রযুক্তির জয়? তেহরানের মতো একটি হাই-সিকিউরিটি জোনে ঢুকে এমন হামলা চালানো ইরান সরকারের জন্য এক বিশাল ‘Intelligence Failure’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাদের অত্যাধুনিক ‘Tracking System’ এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘Mossad’-এর নিবিড় সমন্বয়েই এই অসাধ্য সাধন হয়েছে।
বর্তমানে ইরানজুড়ে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে সৃষ্ট এই শূন্যতা এবং বড় ধরনের নেতৃত্বের সংকট ইরানকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।