রাজবাড়ী জেলা শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকা—সর্বত্রই এখন মশার মরণকামড়। সকাল, দুপুর কিম্বা রাত, মশার উপদ্রবে কার্যত অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন রাজবাড়ী পৌরসভার বাসিন্দারা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়মিত ট্যাক্স পরিশোধ করলেও মশক নিধন বা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মতো ন্যূনতম নাগরিক সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে পৌর কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে মশক নিধন কার্যক্রমে স্থবিরতা চলায় শহরজুড়ে এখন ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো পানিবাহিত ও পতঙ্গবাহিত রোগের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি (Public Health Risk) তৈরি হয়েছে।
চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নাগরিক জীবন পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, যত্রতত্র পড়ে থাকা আবর্জনার স্তূপ এবং সংস্কারহীন ড্রেনগুলো এখন মশার নিরাপদ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভোকেশনাল রোডের বাসিন্দা রনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাড়ির পাশেই পৌরসভার ড্রেন, যা মশার ফ্যাক্টরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মশার কয়েল জ্বালিয়েও নিস্তার মিলছে না। কয়েলের ধোঁয়ায় পরিবারের নারী ও শিশুদের শ্বাসকষ্ট (Respiratory problems) দেখা দিচ্ছে। পৌরসভা কোটি কোটি টাকা ট্যাক্স নিলেও আমাদের সুরক্ষা দেওয়ার কেউ নেই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ মশার কয়েল বা অ্যারোসল ব্যবহার ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করতে পারে। অথচ মশার হাত থেকে বাঁচতে পৌরবাসীকে এই ক্ষতিকর পথই বেছে নিতে হচ্ছে।
ড্রেন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: অব্যবস্থাপনার চ চূড়ান্ত রূপ টিঅ্যান্ডটি জমিদার সড়কসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ড্রেনেজ সিস্টেমের (Drainage System) বেহাল দশা চোখে পড়ার মতো। ময়লা-আবর্জনায় ড্রেনগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে আছে। পচা দুর্গন্ধযুক্ত পানি রাস্তায় উপচে পড়ছে, যা মশা-মাছির বংশবিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রুহুল জানান, ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করা এবং নিয়মিত লার্ভিসাইড (Larvicide) স্প্রে না করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। লজিস্টিক সাপোর্ট থাকা সত্ত্বেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রশাসনিক শূন্যতা ও ফগার মেশিনের নীরবতা স্থানীয়দের দাবি, আগে মশক নিধন কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করতেন জনপ্রতিনিধিরা। বর্তমানে জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসনিক তদারকি শিথিল হয়ে পড়েছে। গত ২ থেকে ৩ বছর ধরে শহরের রাস্তায় ফগার মেশিনের (Fogger Machine) সেই পরিচিত শব্দ আর শোনা যায় না। ফলে মশা নিধনের ওষুধ আদৌ ছিটানো হচ্ছে কি না, তা নিয়ে চরম সংশয় রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি বনাম বাস্তবতা মশার উপদ্রব ও নাগরিক অসন্তোষের বিষয়ে রাজবাড়ী পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহা. রবিউল হক জানান, তাদের কাছে ৩টি কার্যকরী ফগার মেশিন এবং পর্যাপ্ত লার্ভিসাইড মজুদ রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে ২০০ লিটার ওষুধ সংগ্রহ করেছি এবং মশক নিধনের কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে পাইলট বেসিসে (Pilot Basis) অধিক উপদ্রবপ্রবণ এলাকাগুলোতে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। দ্রুতই পুরো পৌর এলাকায় এই কার্যক্রম জোরদার করা হবে।”
তবে কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, লোকদেখানো ‘পাইলট প্রজেক্ট’ নয়, বরং টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste Management) এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানই পারে রাজবাড়ীকে মশকমুক্ত করতে। অন্যথায় সামনের বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের (Dengue Outbreak) আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।