পবিত্র রমজান মাস, প্রখর গ্রীষ্মকাল এবং বোরো সেচ মৌসুম—এই তিনের সমন্বয়ে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা এখন তুঙ্গে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতীয় গ্রিডের (National Grid) ওপর চাপ কমাতে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে গ্রাহকদের জন্য সাতটি অত্যন্ত জরুরি ও বাধ্যতামূলক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করছে, গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতা ও শক্তির পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই চ্যালেঞ্জিং সময়েও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। নিচে গ্রাহকদের জন্য নির্দেশনাসমূহ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. সেচ পাম্প পরিচালনায় নির্দিষ্ট সময়সূচি কৃষিখাতে সেচ কাজ বিঘ্নিত না করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে রাত ১১টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত সেচ পাম্প চালু রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে পাম্প চালালে গ্রিডের ওপর চাপ কম থাকে এবং কৃষকরাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন।
২. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সেচ প্রদান বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সর্বোচ্চ সাশ্রয় নিশ্চিত করতে কৃষকদের 'অ্যাল্টারনেট ওয়েট অ্যান্ড ড্রাই' (Alternate Wetting and Drying) বা পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতিতে সেচ কাজ সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটি পানির অপচয় কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খরচও সাশ্রয় করে।
৩. এসির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ (Optimal Temperature) গ্রীষ্মের গরমে এসির ব্যবহার বাড়ে, যা বিদ্যুতের চাহিদাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এসি বা এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি এনার্জি এফিসিয়েন্সি (Energy Efficiency) বজায় রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।
৪. আলোকসজ্জা পরিহার বিদ্যুতের অপচয় রোধে এবং লোড ম্যানেজমেন্ট (Load Management) ঠিক রাখতে দোকানপাট, শপিং মল, পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা সম্পূর্ণ পরিহার করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
৫. অবৈধ সংযোগ ও হুকিং বন্ধ বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে হুকিং বা যেকোনো ধরনের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে বিরত থাকতে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। অবৈধ সংযোগ সিস্টেম লস বাড়িয়ে দেয় এবং ট্রান্সফর্মার বিকল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
৬. ইজি বাইক ও অটোরিকশা চার্জিংয়ে সতর্কতা দেশের বিভিন্ন স্থানে ইজি বাইক ও অটোরিকশার ব্যাটারি অবৈধভাবে চার্জ করা হয়, যা গ্রিডের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে এবং বৈধ উপায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৭. পিক আওয়ারে ভারী যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখা প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সময়কে 'পিক আওয়ার' (Peak Hour) হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসি, ওয়েল্ডিং মেশিন, লন্ড্রি, ওভেন বা মাইক্রো ওভেন, হিটার, পানির পাম্প, ইস্ত্রি এবং বৈদ্যুতিক বিলবোর্ডসহ অধিক বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী সরঞ্জামাদির ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার জন্য গ্রাহকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের বার্তায় বলা হয়েছে, জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতাই পারে এই সংকটময় সময়ে একটি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা উপহার দিতে। প্রতিটি গ্রাহক যদি নিজের অবস্থান থেকে সচেতন হন, তবে রমজান ও সেচ মৌসুমে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা অনেক সহজ হবে।