• আন্তর্জাতিক
  • মার্কিন রণতরীর মৃত্যু কি ঘনিয়ে আসছে?

মার্কিন রণতরীর মৃত্যু কি ঘনিয়ে আসছে?

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
মার্কিন রণতরীর মৃত্যু কি ঘনিয়ে আসছে?

সমুদ্রবক্ষে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কয়েক দশক ধরে রাজত্ব করছে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার (বিমানবাহী রণতরী)। কোনো বিদেশি ঘাঁটির সাহায্য ছাড়াই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে আকাশপথে হামলা চালানোর সক্ষমতা এই দানবীয় জাহাজগুলোকে অনন্য করে তুলেছে।

তবে ২০২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই রণতরীগুলোর টিকে থাকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের উত্থান এই আলোচনার পালে হাওয়া দিচ্ছে।

জাতীয় নিরাপত্তা গবেষক জ্যাক বাকবি তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে বিমানের রণতরীগুলো এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এক সময় সমুদ্রের রাজা হিসেবে পরিচিত যুদ্ধজাহাজগুলো যেভাবে প্রযুক্তির বিবর্তনে হারিয়ে গিয়েছিল, বিমানবাহী রণতরীগুলোর পরিণতিও তেমন হবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে মার্কিন নৌবাহিনী এখনই এই জাহাজলোকে বাতিলের খাতায় ফেলতে নারাজ।

এই বিতর্কের মূলে রয়েছে চীনের অভাবনীয় সামরিক আধুনিকায়ন। বেইজিং বর্তমানে ডিএফ-২১ডি এবং ডিএফ-২৬ এর মতো অত্যাধুনিক ‘ক্যারিয়ার-কিলার’ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যা কয়েক হাজার মাইল দূর থেকেই চলন্ত রণতরীকে নিখুঁতভাবে আঘাত করতে সক্ষম। এর সাথে যুক্ত হয়েছে হাইপারসনিক অস্ত্র এবং উন্নত সাবমেরিন প্রযুক্তি। ফলে ১৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি ফোর্ড-ক্লাস সুপারক্যারিয়ার এখন শত্রুপক্ষের জন্য অত্যন্ত দামী এবং সহজ লক্ষ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বিশাল বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একটি একক সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেবল কয়েক হাজার নৌসেনার প্রাণহানি ঘটাবে না বরং আমেরিকার কয়েক বছরের পরিশ্রম ও বিপুল অর্থ নিমেষেই ধ্বংস করে দেবে। এই আর্থিক ও কৌশলগত ঝুঁকি সত্ত্বেও পেন্টাগন মনে করে, বিমানবাহী রণতরী ছাড়া বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখা অসম্ভব। কারণ, ভূমিভিত্তিক বোমারু বিমান বা একক ব্যবহারের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন।

বর্তমান পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের রণকৌশলে আমূল পরিবর্তন আনছে। এখন আর আগের মতো শত্রুর উপকূলের খুব কাছাকাছি রণতরী নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। বরং অনেক দূর থেকে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মতো অভিযানে নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। মার্কিন রণতরীগুলো এখন আর কেবল বিমান বহনের মাধ্যম নয় বরং এগুলো পরিণত হচ্ছে একটি সমন্বিত কমান্ড হাবে।

এই বিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো এমকিউ-২৫ স্টিংগ্রে ড্রোন। এটি মূলত একটি চালকবিহীন আকাশযান, যা মাঝ আকাশে অন্যান্য যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে। এর ফলে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত উড়াল দিয়ে হামলা চালিয়ে আবার নিরাপদে রণতরীতে ফিরে আসতে পারছে। ড্রোনের এই সংযুক্তি রণতরীকে সরাসরি শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার বাইরে রেখেও কার্যকরভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

একই সাথে মার্কিন নেভি ষষ্ঠ প্রজন্মের এফ/এ-এক্সএক্স ফাইটার জেট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই অত্যাধুনিক বিমানগুলো স্টিলথ প্রযুক্তি এবং ড্রোন নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন হবে। ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে বিমানের রণতরীগুলো কেবল পাইলট চালিত বিমানের ওপর নির্ভর করবে না বরং এগুলো হবে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের একটি ভ্রাম্যমাণ লঞ্চিং প্যাড। এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরই আগামী দিনে রণতরীর প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখবে।

তাই সমুদ্রে বিমানের রণতরীর একক আধিপত্যের যুগ হয়তো শেষ হয়ে এসেছে, কিন্তু এর কার্যকারিতা ফুরিয়ে যায়নি। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে এটি এখন নিজেকে একটি নতুন রূপে সাজিয়ে নিচ্ছে। চীনের এ২/এডি বা নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করতে এই রণতরীগুলোই হবে আমেরিকার প্রধান তুরুপের তাস। সময়ের প্রয়োজনে বিবর্তিত হয়ে এই বিশাল জলযানগুলো আরও বহু বছর বিশ্ব রাজনীতি ও সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

Tags: মৃত্যু মার্কিন রণতরী